Reflections

“মব” শব্দটির সমস্যা কোথায়?

অনেকেরই ধারণা যা চলছে তা হলো “মবের মুলুক”।

আসলেই কি তাই?

ইংরেজি “মব” (mob) একটি abstract ধারণা। দেশের কিছু জনগণ একসাথে হলেই তাকে মব বলা হয়।‌ এই অবস্থায় সব ধরনের মানুষের ব্যাক্তিগত পরিচয় বিলুপ্ত হয়ে যায় অথবা আড়ালে চলে যায়। কেউ বুঝতে পারে না যারা জড়ো হয়েছে তারা কে কোন মনের-ধ্যানের, কে কোন আইডোলজির, কে কোন ধর্মের, কে কোন রাজনৈতিক দলের, কে কোন লিঙের, কে কোন প্রফেশনের, কে কোন জেলার, কে কোন উদ্দেশ্যের।‌ সবাইকে একসাথে মিশিয়ে এক কাতারে নিয়ে ফেলে তাদের মোরাল প্রবলেম মাপা হয়।

আজকের বাংলাদেশে যাদের এই মুলুকের “রাজা” বা ” ক্ষমতাধর” ভাবা হচ্ছে তারা কি এসব পরিচয় থেকে মুক্ত? গত ১৬ বছরে কি একজন সাধারণ মানুষও ছিল যাদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং দল ছিল না, ইনক্লুডিং নিপীড়িত নির্যাতিত দলগুলের মানুষ? একদিকে মজলুমের যন্ত্রণা কান্না রক্ত মৃত্যু দেখেছি আর অন্যদিকে দেখেছি সবচেয়ে গোবেচারা সবচেয়ে নিরীহ সবচেয়ে শান্তিপ্রিয় মানুষদেরও মিনমিন করে হাসিনা পূজো করতে।‌ ইঁদুরের গর্তের ইঁদুরও স্বৈরাচারের দূরতম যোগসাজশ সফট সমর্থক হয়ে উঠেছিল। সেই সময়ে আমি কাউকে কাউকে প্রশ্ন ও করেছিলাম, “আপনিও? উনিও? কিন্তু কেন?”

তো এই অবস্থায় “মব” কে কালারলেস ( colorless) বানানো কি আসলেই যুক্তিযুক্ত? এর মানে এই কথা বলা না যে, সব ধরণের মানুষ সম্মিলিতভাবে অপরাধ করতে প্রস্তুত এবং করছে? এবং এর ভেতর আমি আপনি সে তুমি সবাই আছ? বাংলাদেশের সবাই শুধু বাচ্চা, বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষ ছাড়া?

তাই “মব” শব্দটা শুনে আমি চমকে উঠি। আমি এই ভাষা নিতে পারি না। এটা শুনলে প্রথম যে প্রশ্ন আমাকে ধাক্কা দেয় এবং যা আমি আমাকে করি, তা হলো, “আমি কি এমন যে মানুষকে এমনি এমনি আঘাত করতে কিংবা মারতে পারি?” এরপর আমি নিজেই এর উত্তর দিই, “না, আমি পারিনা। কারণ আমি কখনো এরকম অন্যায় করা দূরে থাক, অন্যায় হবে ভাবলেই ভয়ে কেঁপে উঠি। হায় হায় করি। কষ্ট পাই। আমি এভাবে প্রোগ্রামাড না!”

আমি বলবো, যারা মবের মুলুক বলে জপ করছেন, এই একি প্রশ্ন আপনি নিজেকে করুন। তখনই বুঝতে পারবেন, আপনি ঐ “মব” শব্দ বা দলের কিনা যারা ভয়ানক সব কাজ করছে। এখানে ওখানে। যদি আপনি ঐ অপরাধী কাজ করতে পারা দলের হন ভিন্ন কথা! আর যদি এই দলের না হন, তখনি আপনার যে প্রশ্ন মনে আসবে আমি শিওর, “তাহলে এসব অরাজকতা কে করছে? কে বার বার তাদের হাত রক্তে রঞ্জিত করছে? কারা আগুন নিয়ে খেলতে থাকে? কাদের এত রাগ? এত ঘৃণা, এত হঠকারিতা?”

স্বাগতম, অপরাধ এবং অপরাধী সনাক্ত করার প্রথম স্তরে আপনি পৌঁছেছেন।‌
আর এসব প্রশ্নের মাধ্যমে আপনি বুঝতে পারবেন, অপরাধীরা “মব” নয়, “মব” থাকে না। তাদের রঙ, আইডোলজি, দল, মোটিভ, এবং প্রফেশন আছে। তাদের নিজস্ব স্টেক আছে তাদের কাজকর্মের জন্য। আর এই চিহ্নিতকরণ হলো বিচারের পথ উন্মুক্ত হোয়া।অপরাধ ব্যক্তিগত দায় থেকে শুরু হয় এবং এর শাস্তিও ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করতে হয়।‌

একটা ঘটনা বলি বেশ কয়েকদিন আগে, বাংলাদেশী এক স্টুডেন্ট অষ্ট্রেলিয়ায় একটি আইনি ঝামেলায় পড়ে যায়। সে যেখানে কাজ করতো সেই রেস্টুরেন্টে নিজের হেডম দেখাতে গিয়ে বাংলাদেশে তার স্কুল কলেজের সহপাঠীদের সাথে কি কি করতো তার এক সহকর্মীকে বলে। তার কাজের ফিরিস্তি শুনে এ দেশী ছেলেটি খুব ভয় পেয়ে যায়। সে ম্যানেজারের কাছে সব বলে এবং ম্যানেজার পুলিশ কে জানায়, বাংলাদেশের এক অপরাধী এখানে চলে এসেছে। তখন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

এই ঘটনা পড়ে আমি খুব খুব অবাক হয়েছিলাম। কেন জানেন? আমাদের ইয়াং জেনারেশনকে গত ১৬ বছর কিংবা তারোও আগে ক্রাইমের সাথে অভ্যস্ত করে তোলা ছিল শাসকদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। একপর্যায়ে তারা ভুলে গেছে অপরাধ কোনটা? কোনটাতে হেডম দেখাতে হয়! দলীয় সরকারের অধীনে দলের রাজনীতিতে ন্যায় অন্যায়ের যে নূন্যতম সংজ্ঞা এবং সেনস সেসব তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল। এজন্য “এই মার এই ধর” বললে একদল না জেনে না শুনে ঝাপায়ে পড়ে এবং অপরাধ করতে পিছপা হয় না।

এরা “মব” না। এরা বিশেষ কেউ। এদের অবশ্যই রঙ আছে। তাই মব বলে বলে আমি অপরাধীদের রঙহীন করতে পারিনা। বিচারের পথ ধোঁয়াশা এবং বন্ধ করতে পারিনা। তাই এখন যা চলছে, তা গভীরভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ড। দুঃখজনক হলেও সত্যি।

উম্মে সালমা
২১/০৯/২০২৪

Leave a comment