Reflections

আফটার আগস্ট ৫ঃ আবেগ ও নৈতিকতার দোলাচল ? একটি রিফ্লেক্সসন

আগস্ট ৫। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি নতুন দিন। একটি নতুন ইতিহাস। এই দিনটি ফ্যাসিবাদের পতনের মাধ্যমে নতুন এক স্বপ্নের সুচনা করে, প্রায় দেড় হাজারের বেশী শহীদ এবং ত্রিশ হাজারের ও বেশী মানুষের আহত হবার মাধ্যমে । এটি একটি দারুণ জাগরণ । নানা রকম দুঃশাসনে ১৬ টি বছর জর্জরিত মানুষ এই দিনে সাম্য, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদা নিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে ।

কিন্তু chaos এবং organic প্রসেসের মাধ্যমে আচানক উঠে আসা আন্দোলন কি আচানক সব প্রত্যাশা পুরন করতে পারে? পারবে? এ নিয়ে যখন ভাবি, ফ্রেন্স রেভুলিউশন (French Revolution) এর কথা মনে পড়ে। ফ্রেন্স রেভুলিউশন খুব জটিল এবং বহুমুখী একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল। এর মূলমন্ত্র হিসেবে ছিলো স্বাধীনতা (liberty), সমতা (equality), এবং ভ্রাতৃত্ব (fraternity)। এত সুন্দর মটোগুলো! একসময় খুব অল্প বয়সে যখন এগুলো পড়েছিলাম কি অসাধারণ যে লাগতো! মনে মনে ভাবতাম, আহা! যদি সত্যি এরকম হতো একটি সমাজ! স্বাধীনতা, সমতা, এবং ভ্রাতৃত্ব !

কিন্তু ১৭৮৯ এর পরে ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া নানা অঘটন যেমন নেপোলিয়নের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা, রবেসপিয়ারের এক্সিকিউশন, রেইন অফ টেরর এবং কাউন্টার রেভুলিউশনের সাসপেকট হিসেবে বহু মানুষের শাস্তি, হত্যা, জেল, জুলুম, নারীদের সমতার জন্য লড়াই ইত্যাদি,  যা একের পর এক দানা বেধেছিলো ১৮৩৪ সাল পর্যন্ত, সত্যি ভয়াবহ। এগুলো আমার বুক কাঁপিয়ে দেয়। যত পড়ি, তত দেখি, ইতিহাসবিদরা এই বিপ্লব নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কিছু কমন কথা বলেন যা সারমর্ম হোলো, পরিবর্তনের পজিটিভ উদ্যোগ নেয়া এবং তার বাস্তবায়নের চেয়ে যে কোন মোনারকির বিরোধীতা করা সহজ । গরীবদের প্রতি সহানুভূতি সবার থাকে কিন্তু “existing social system significantly” পরিবর্তন করার ইচ্ছা এবং সক্ষমতা বিপ্লব পরবর্তী প্রভিশানাল সরকারের থাকে না। তারা দেখে যে একটি সাংবিধানিক সংসদ আসা পর্যন্ত তাদের মূল ভূমিকা হলো অর্ডার আর এডমিনিষ্ট্রেশন চালিয়ে রাখা । তারা আর কোনো ভায়লেন্স চান না তাই এক্সিস্টিং “authorities” এবং “bureaucratic system and organisations” টিকিয়ে রাখেন। তো, বিপ্লব পরবর্তী সময় হয়ে ওঠে আরো কেয়টিক।‌

বাংলাদেশে যা ঘটছে প্রতিনিয়ত যা প্রতিনিয়ত আমাদের নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে নতুন নতুন অপোজিশনের জন্ম দিচ্ছে এটা আসলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। যদিও বাংলাদেশে এখন রেইন অফ টেরর জাতীয় কিছু হয়নি বা হবার সম্ভাবনা নেই (পুরাদাগে একটা plurality এবং reconcliation এর আবহের জন্য), যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা হলো, কাউন্টার -বিপ্লবের ক্রম শক্তি প্রদর্শন এবং বিপ্লব বেহাত হবার ভয়। এর পেছনে কাজ করছে একটি বংশগত এবং সামাজিক লতায়-পাতায় জড়ানো সামাজিক সম্পর্ক যা দক্ষিণ এশিয়ায় বিরাজ করে। প্রত্যেক মানুষ প্রত্যেক পরিবার প্রত্যেক সামাজিক লেনদেন ব্যবসা বানিজ্য “inter-political programme” এর সুতোয় বাঁধা।

এই বিষয়টি আমাকে ২০১৩ সালে থেকে ভাবাতো। যখন শাহবাগ আন্দোলন হচ্ছিল এবং পুরো বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হলো বিভক্তির এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি, আমার তখনকার লেখা কবিতায় (“সংসার এবং সহবস্থান” ) এটা নিয়ে একটা আলাপ উঠে এসেছিলো । আমি বুঝতে পারতাম না কিভাবে একটা সমাজে এই জড়াজড়ি (entanglements) খুলে নির্মূলের রাজনীতি করা যাবে?

পুরো ফ্যামিলিতে আমাদের অঙ্গনে আমরা কখনো রাজনীতি দিয়ে বিভাজন দেখিনি। নানাজন নানা দল সাপোর্ট করতো কিন্তু একে অন্যকে শুধু “রাজনীতির চোখ” দিয়ে দেখা এটা ছিলোনা। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে ২০১৩ সালে এটা আমদানী হয় দেশীয় অঙ্গনে আওয়ামী এবং বামধারার রাজনীতির হাত ধরে এবং তার পর তো আমরা সবাই জানি……নোয়াখালীর ভাষায় এদেরকে বলে, “চোখ খাটা তেলী”। আওয়ামী এবং তার দোসররা চোখ খেটে মানে চোখ বন্ধ করে তারা ছাড়া সবাইকে শেষ করার পথে নেমেছিল এবং শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত শেষ করে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল।

এসব বলার মানে এই যে, বিভাজনের রাজনীতি তৈরি করা দল এবং মানুষ গুলো আজ যখন বিপদে, যখন তাদের ব্যক্তিগত এবং আইনগতভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর সময়, তখন কিছু দল এবং মানুষের মাঝে সেই রাজনীতির উর্ধ্বে ওঠার একটা প্রবনতা এবং এবং তার সাথে ন্যায় বিচারের একটা সুত্র তৈরি করার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে । ক্ষমা, রাজনীতির নানা অধিকারের বয়ান, অপরাধ লঘু করে দেখা, কিংবা আওয়ামী সমর্থকদের প্রতি (গোপন?) সমবেদনা ইত্যাদি সেরকম কিছুর বহিঃপ্রকাশ। অনেকে আবার এটা মক্কা বিজয়ের পরবর্তী সাধারণ ক্ষমার বয়ান দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চান। কেউ কেউ আবার “শাস্তি এবং ক্ষমা”র একটি অসম বণ্টনে এক ধরনের বিচারের কথা বলেন।

স্বাভাবিক ভাবেই সেটা বিপ্লবের সেনটিমেন্টে তীব্র আঘাত। কারণ যারা ইচ্ছে করে জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং সেটা জাষ্টিফাইড করে এবং করেই যায় কোন রকম অনুশোচনা এবং তাওবা না করে, তাদের বিচারই ন্যায়বিচার। casualties হয়ে যাবার একটা শঙ্কা এখানে আছে, যেমন থাকে সব বিচারে, কিন্তু তারপরও দুঃসহ দেশ সৃষ্টিকারীদের বিচার আবশ্যক ।

অভ্যুত্থান পরবর্তী এই সময়ে , এই একটু softness, একটু reconciliation একটু বিভাজন মানুষকে confused এবং ambivalent করে তোলে । আশা আনন্দ দুরাশা দুশ্চিন্তা এককথায় একধরনের সার্বক্ষণিক দোলাচলের জন্ম দেয় মানুষের মনোজগতে।‌ মানুষের সামনে আরেকটি পরিবর্তিত পৃথিবী এবং পরিস্থিতিতে আগের নৈতিক ফ্রেমে দেখা পরিস্কার ছবির (যেখানে সত্য/মিথ্যা জালিম/মজলুম বাইনারি একদম ক্লিয়ার ছিলো) মূল্যায়নে একটি ধাঁধা লেগে যায়।‌ প্রতিদিনের নতুন নতুন ইস্যুতে বিপ্লব বিষয়ক আবেগ অনুভূতি ত্যাগ তিতিক্ষার একনিষ্ঠ সমর্থক এবং সহযোগীরা প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসেব কষতে গিয়ে দুলতে থাকে নানাবিধ দোলাচলে। কোনটি সঠিক কোনটি বেঠিক কে ঠিক বলছে কে ভুল বলছে কোনটি উপকারী কোনটি অপকারী এর চিহ্নিত করণ এবং মেজাজ বোঝা অনেক সময় জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।‌ তারা বুঝতে পারে না যে মানুষগুলো দুদিন আগেও বিপ্লবের পক্ষে কাজ করেছে তাদের সম্পর্কে রটে যাওয়া কথাগুলো কতটুকু সত্য ??? যে যায় লঙ্কায় সে ই কি রাবণ হয়ে উঠে ??? নাকি এটা আবার কোন বিশাল ফাটলের লক্ষণ?

একটা কথা নিদারুন সত্য যে সাধারণ মানুষের বিপ্লবে যতৈ অবদান থাকুক, কোন দেশ তো সবাই মিলে শাসন করা যায় না। হাতে গোনা কয়েকজন (always only a few) ক্ষমতা পায় এবং বাকিরা তাদের নিত্যদিন একি রকম জীবন যাপন করতে ঘরে ফিরে যায়। সুতরাং বিপ্লবী-দিনের ইউফোরিয়া কমে আসার বাস্তবতায় “জীবন কতটুকু পরিবর্তন হলো” (“how far our life has changed/ improved”) এই প্রশ্ন বারবার মাঠে ঘাটে অফিসে বাজারে প্রতিনিয়ত মানুষকে ভাবাতে থাকে, কারণ বিপ্লব হয়েছে ঠিকই, কিছু মানুষ পালিয়ে আছে/গেছে, কিন্তু the old structure is still intact, a structure which sheer gathering of a mass cannot dissolve and resolve. It needs a systematic functioning by a group of skilled persons which is rather a slow process and a job, again, of a very “few” in power, law, administration, and bureaucracy. আর এই বুরোক্রাটিক ব্যবস্থা ১৯৪৭ ব্রিটিশরা এবং ১৯৭১ এ পাকিস্তানীরা চলে যাবার পর যে সমস্যা ফেস করেছিলো মোটাদাগে সেটাই ফেস করছে । আন্দোলন পরবর্তী অনেক অনেক গুলো পজিটিভ উদ্যোগ নেয়া হলেও এবং কিছুক্ষেত্রে নতুন নতুন ব্যবস্থা/ রদবদল হলেও বুরোক্রাটিক ব্যবস্থা এবং ওভারোল জাতি এখন ও বিপদ্গ্রস্থ। একসাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একমত হয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়া, জীবন যাপনের একটি গুনগত পরিবর্তন এটা এখনও দেখা যাচ্ছে না।

তাই সাধারণ মানুষেরা আন্দোলনের ফসল সহসাই ঘরে তুলতে পারবে না বলেই মনে হচ্ছে।‌ বিভিন্ন স্থানে যখন বিভিন্ন গ্রুপে গ্রুপে “processes of resistance” চলছে, কিন্তু এসবের ভেতরেও সবখানে আশা নিরাশার দোলাচল। এখনো অনেক বিষয়ে বিষয়ের এত এত জটলা আর জটিলতা যে আমাদের মনোজগত একদম টালমাটাল। ফ্যাসিবাদের পতনে আমরা খুশি কিন্তু ফ্যাসিবাদের অবশিষ্ট/রেসিডু কিভাবে মোকাবেলা করে সার্বিকভাবে শান্তিময় দেশ হবে সেটা মনে হচ্ছে যেন ইউটোপিয়া। এই সময়ে তাই Animal Farm আবার যেন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে । আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের Boxer and Clover এর মতো মনে হয়। বার বার আহত হয়েছেন তাদের মানুষগুলোর খবর এবং ছবিগুলো দেখি এবং নিদারুন কস্ট লাগে। সবাই কত বিষয় নিয়ে কাইজ্যা করছে, আর তারা? কষ্টে কষ্টে পারে করছে প্রতিটি মুহূর্ত ! এদের দিকে তাকিয়ে হলেও দেশটাকে কি একটু শান্তি দেয়া যায় না? জুলাই বিপ্লবের/ অভ্যুত্থানের লক্ষ্য সামনে রেখে সব কাজ করা যায় না? এসব ভাবি আর মনে হয়, আমাদের সামনে এখনো বোধয় সীমাহীন পথচলা।

উম্মে সালমা, ১৬/১০/২০২৪

Leave a comment