Reflections

সত্য বলার সাহসকে সাধুবাদ

প্রিয় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ,

গতকাল আপনার দ্রব্যমূল্য বিষয়ক সাহসী বক্তব্য শুনলাম। শুনে মনে হলো একটি নতুন সংগীত শুনছি, এমন একটি সংগীত যা বাংলাদেশের একজন শিল্পী এখনি লিখেছেন এবং এখনি সুর দিয়েছেন। মনে হলো এই এতটুকু জীবনে এমন সংগীত বাংলাদেশের কোন শাসকের প্রতিনিধিদের মুখে শুনিনি। মনে হলো একটি নতুন সূর্য উঠছে একটি নীল দিগন্তে, চারপাশ ঘিরে থাকা শত সহস্র বছরের দুঃসহ অন্ধকারকে পরাজিত করতে করতে…

এই যে সাহসী হয়ে বলা প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাব, এই যে পরিস্কার করে বলা অলস চাটুকারিতা আগের সময়ের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়ে উঠা এবং সেই সাথে ওয়ারণিং দেয়া যে আমরা সিন্ডিকেট ভেঙে দেবো বিশ্বাস করুন ভাই এখানে আমি এই ধরণের কথা আমার এই জীবনে দেশের মাটিতে কাউকে বলতে শুনিনি । আর এখানে আমি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই। আমি যেন শুনতে পাই যুগের শার্দুলের কন্ঠ যারা যুগে যুগে দুঃশাসনের স্থানে সুশাসনের জন্য লড়াই করেছে। আমার মন আনন্দে নেচে ওঠে যেন আপনারা এক এক জন বখতিয়ার ঘোড়ায় চড়ে আসছেন দুঃখভরা বাংলার আজীবন সংগ্রামরত মানুষকে শান্তির বাণী শোনাতে। এই সময়ে এই একবিংশ শতকে।

আমি দূর প্রবাসী একজন ক্ষুদ্র শিক্ষক এবং গবেষক। আমি রাজনীতি বুঝি না। রাজনীতি করি না। কিন্তু আমার পরিবার আমার আত্মীয় স্বজন আমার দেশের সাধারণ মানুষেরা যখন বাজারের উত্তাপে জ্বলে পুড়ে মরে এবং বার বার আয় আর ব্যয়ের হিসাব মিলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে থাকে আমার খুব কষ্ট হয়। আমি যখন দেখি এখানে এই বিদেশে একজন সাধারণ মানুষ পর্যন্ত একটা আয় আর ব্যয়ের সামঞ্জস্যতা নিয়ে জীবন যাপন করে, যখন দেখি এখানকার সরকারের মানুষেরা জনগণের জীবন যাপন সহজ করতে প্রতিনিয়ত চেষ্টা সাধনা করতে থাকে, আমার নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। মনে হয় কেন আমার জন্মভূমিতে এরকম শাসক আসে না? কেন শাসক হওয়া মানে “বিকামিং এলিট” এবং তারপর “রুল অফ এলিট”? একপক্ষ ধুঁকে ধুঁকে মরে আর আরেক পক্ষ ঝলমলে আলো ছায়ায় অর্থ সম্পদের পাহাড়ে ফূর্তিতে লিপ্ত থাকে?

এত সবের মাঝে একদল প্রজ্ঞাবান তরুণদের সংগ্রাম করে উঠে আসা জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে, আমি মেসমেরাইজড হয়ে যাই।‌ কিভাবে সম্ভব? এত সবের মাঝে একদল চিন্তক তরুণদের ইতিহাসের ইনসাইটফুল ইনক্লুসিভ পুনঃপাঠ আমাকে অভিভূত করে।‌ এত সবের মাঝে পুরোনো অন্যায় অভ্যাস আর অভিপ্রায়ের ধারা ভেঙে দিয়ে আপনাদের মতো একদল তরুণের অসম্ভব সাহসী উচ্চারণ” আমরা ভেঙে দেবো” শুনে আমি কুল কিনারা পাই না। কিভাবে সম্ভব?

এইতো সেদিন ও মনে হতো এভাবেই জীবন যাবে। দেশের কোন ভবিষ্যত নেই । মনে হতো নিজের সন্তান্দের একটি সুন্দর দেশের গল্প বলতে পারবো না। এভাবেই রুটলেস হয়ে বিদেশে আমাদের বাচ্চারা মানুষ হবে আর দেশকে একটা সাময়িক বেড়ানোর জায়গা ছাড়া কিছু ভাবতে পারবেনা।

ঠিক সেই সময়ে…আপনারা দেশ, ইতিহাস, শাসন নিয়ে এমন কিছু কথা বলছেন…স্বৈরাচারের বয়ান ভেঙ্গে দিচ্ছেন আমরা সত্যই অবাক হয়ে পড়ছি। যে কথা আমরা বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুরছি বলতে পারি নি, যে কথা কিভাবে বলবো যেটা বুঝতে আমাকে গবেষণার একটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, সে কথা আমাদের ছোট ছোট ভাইয়েরা আমাদের পর পর এসে বলে দিচ্ছে এবং সে সব কথা বাস্তবায়ন করবে বলে সাহসী বক্তব্য দিচ্ছে, এটা দেখে সত্যি সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে মাথানত হয়ে আসে। ইতিহাসের যতটুকু পাঠ আছে মানব সভ্যতার ইতিহাসে যখনি জুলুম নির্যাতন অন্যায় বেড়ে গেছে যখনি মজলুমের যন্ত্রণা কান্না রক্ত মৃত্যু অসহনীয় হয়েছে তখনই আল্লাহ এমন একদল লোককে তার জমিনে পাঠান এই জমিনকে বিপর্যয় হতে রক্ষা করতে। এটাই আল্লাহর নিয়ম। তিনি মানুষকে একেবারেই ছেড়ে দেন না।

আপনারা কতটুকু সফল শেষ পর্যন্ত হবেন জানি না, তবে আমি বিশ্বাস করি এবং বিশ্বাস করতে চাই আপনারা সেই সাহসী একদল যারা অন্যায়কে রুখে দিয়ে এর বিস্তৃত ডালপালাকে কেটে ফেলার হিম্মত রাখেন। আপনারা ইতিহাসের সঠিক দিকে আছেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে তাদের জীবন স্বস্তির ছায়া নামানোর সাহস রাখেন।‌ আর এইটা যখন ভাবছি এখন এইসব বলছি এর মানে এই না যে আমি চাটুকারিতা করছি কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার জন্য। এই জীবনে কোনদিন কাউকে তেল দিয়ে এই পর্যন্ত আসিনি এবং সামনে ও কোনদিন যাবো না তেল দিয়ে কিছু পাবার জন্য। (মেধা আর মাথা উঁচু করে যে জীবন দাঁড়িয়েছে সে কবর পর্যন্ত আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নত হবে না।)

কেন লিখছি তবে? লিখছি যেন এই দিনগুলো লেখার মাধ্যমে থেকে যায়। যেন পরবর্তী সময়ে পরবর্তী প্রজন্ম জানে কি করে ২০২৪ জুলাই বিপ্লব মানুষের মনে আশা আর স্বপ্ন জাগিয়েছিল। কিভাবে কিছু তরুন তরুনী দেখিয়ে দিয়েছিল, “এখন যৌবন যার যুদ্ধ করার তার শ্রেষ্ঠ সময়” । কিভাবে প্রবাসী নারীরা যারা নিজেদের জীবনে বেঁচে থাকার সব উপকরণ থাকার পরও দেশের জন্য ভাবতো এবং ভালো কাজের পৃষ্ঠপোষকতা করতো তাদের লেখণী দিয়ে।

আপনাদের হাত ধরে এই মাইনাস প্রান্তের দেশটি একটু একটু করে উঠে আসুক। স্বপ্ন সত্যি হোক। সাধারণ মানুষ ভালো থাকতে শুরু করুক। আজকে খুব মনে পড়ছে আমার এক বড়বোন সহ শেখা একটি কবিতার কিছু লাইন…

“পাথরে পারদ জ্বলে
জলে ভাঙে ঢেউ
ভাঙতে ভাঙতে জানি
গড়ে যাবে কেউ
তন্দ্রার আচ্ছাদন ছেঁড়ে এসো আমরা জেগে উঠি
এসো আমরা গড়ে তুলি আরেক পৃথিবী
গড়ে তুলি প্রজন্মের সাহসী তুফান…”

উম্মে সালমা , ২০/১০/২০২৪, টুঅং






		

Leave a comment