Reflections

স্বমন্বয়ক হান্নানের কান্না: কি ভাবছি!

“বাড়ির পাশে আরশিনগর
সেথায় এক পড়শী বসত করে
আমি একদিন ও না দেখিলাম তারে…”

এই গানটি নিয়ে কলেজ জীবনে একসময় তুমুল আলোচনা হয়েছিল কবিতা পড়া এবং কবিতা লেখা বন্ধু মহলে। কিশোরী কাল। নতুন নতুন আধ্যাত্মিকতার সাথে পরিচয়। কেমন কেমন লাগে এইসব গান শুনলে তাদের বুঝতে চেষ্টা করলে। তার মধ্যে কেউ যদি বলে, এই জানিস “আরশিনগর” মানে কি এই গানে ? মানে হলো মন/রিদয়। বল, তোর মন/রিদয় তোর সাথেই তো আছে, তাকে দেখেছিস? কখনো ?

আরশিনগর দেখিনি, সত্যিই দেখিনি, ইমাম গাজ্জালীর মতো কলবের সন্ধান করতে করতে বুঝতে পারিনি রিদয়/কলব/মন হলো দৃশ্যমান হৃৎপিণ্ডের একটি ফাঁকা জায়গা। কিন্তু এতটুকু বুঝতে পারি রিদয় নামক জায়গা হতে উৎসারিত না হলে স্বমন্বয়ক হান্নানের মতো কেউ কাঁদতে পারেনা, কেউ মনের ভেতর গুমরে থাকা ভাষা বাকরুদ্ধ কন্ঠস্বর এবং চোখের জলে এভাবে ঢেলে দিতে পারে না।

ক্লান্ত বিকেলে তার কান্না দেখে আমি না কেঁদে পারিনি।

এতটুকু জীবনে কম দেখলাম না, কৈ কখনো তো কাউকে তো দেশের জন্য এভাবে কাঁদতে দেখিনি?

ওর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা রেজাল্টের অপেক্ষার পর ভালো ক্যারিয়ার ছিল আমার স্বপ্ন। দেশের জন্য মাঠে নামবো রাস্তায় নামবো ধার্মিক ভালো ছাত্রী হয়ে মেয়ে হয়ে (কিংবা ভালো ছাত্র ছেলেটা হয়ে)? অসম্ভব…বাবা মা পরিবার পিটিয়ে আমাকে চেপ্টা করে ফেলতো। কারণ রাজনীতি খারাপ জিনিস। ঘরে বাইরে সবখানে সবসময় একটা highly protected cocoon ছিল। সীমানা দেয়া ছিল। এটা করবে ওটা করবে না। ঐ যে ঐটা তোমার জন্য। এটা পাবার জন্য চেষ্টা কর।

আর এই ২০১৮ এর স্টুডেন্টরা, ২০২৪ এর হান্নানরা বুদ্ধি হবার পর থেকে স্বৈরাচারী শাসনের habitus থেকে এ স্বৈরশাসনতান্ত্রিক আদর্শ উদ্দেশ্য উদাহরণের পুনঃ পুনঃ ব্যবহারের (reiteration) পরো কেমন যেন একটা স্বাধীন স্বচ্ছ পরিস্কার চিন্তা আর আবেগ নিয়ে বেড়ে উঠেছে এবং তার জন্য জীবন বাজি রেখেছে!

সেই তারা যখন হিউমিলিয়েটেড ফিল করে, তাদের অশ্রু সত্যি বহন করতে পারিনা!

হান্নানের কান্না আর কথা আমি শুনছিলাম আর শুনছিলাম। সাহিত্য পড়তে পড়তে বিশ্লেষণ করার যে চোখ সেটা মাথায় খেলা করছিলো। মিলান কুন্ডেরার The Unbearable Lightness of Being এ একটি কনসেপ্ট শিখেছিলাম, kitsch (কিছ)। একটু অদ্ভুত কিন্তু মজার।

এর অর্থ হলো “art, objects, or design considered to be in poor taste because of excessive garishness or sentimentality, but sometimes appreciated in an ironic or knowing way.” (source: Google)

যখন কোন চিত্র ছবি বস্তু অতিরিক্ত আবেগ, সেন্টিমেন্ট, এবং শোঅফ দেখানোর কারণে খুব বাজে রুচির পরিচয় দেয় তাকে বলে, “Kitsch” ( কিছ্)। মানুষ মুখে মুখে প্রশংসা করে এইসব কিন্তু জানে এটা ফেইক। এটা নিম্ন রুচির কাজ।

একটি উদাহরণ দেয়া যাক। যেমন ধরুন, একজন পলিটিশিয়ান গরীব বাচ্চাদের কিছু দান করছে এবং সাংবাদিকদের সব ক্যামেরা তার দিকে তাক করা। তখন সেই পলিটিশিয়ান এমনভাবে মানবহিতৈষী চেহারা করলেন এবং আবেগঘন কণ্ঠে কথা বলতে লাগলেন যা তার স্বভাবসুলভ না। তিনি এটা করছেন কারণ তিনি জানেন এটা নিউজ হবে। মানুষের কাছে তার একটি ভালো ইমেজ তৈরি হবে।

মিলান কুন্ডেরা এই ধরণের সব কাজ ছবি ইমেজ সবকিছুকে বলেন “kitsch” বা tasteless and vulgar ছবি।

তো হান্নান যখন কথা বলতে বলতে তার কষ্টের আবেগের অভিযোগের পিকে উঠেছিলো, আমি তাকিয়ে ছিলাম। আমি বুঝতে চাইছিলাম ফ্যাসিবাদের জননীর মতো তার কান্না ফেইক কিনা।

কিন্তু না, তার কান্না খুব খুব রিদয়প্রসূত। এখানে কোন অভিনয় নেই কোন রিয়া নেই কোন লোকদেখানো নেই স্বার্থ নেই। এটা কোন “kitsch” নয়, এটা একটি ভয়ংকর সুন্দর পবিত্র সৎ অভিব্যক্তি। ভীষণ ছোঁয়াচে। বাংলাদেশের হাতিয়া উপদ্বীপ হতে উঠে আসা এক বাঙালি মুসলমান তরুণের চাহিদার চিহ্ন।

স্বাধীনতার তিপান্ন বছর পর কলকাতার ভাষায় নয় ঢাকা এলিটদের ভাষায় নয় দেশভাগের পর আসা মাইগ্রেন্টদের ভাষায় নয়, তাদের পোশাক আশাকে নয়, ফিটফাট ফুলবাবু হয়ে নয়, আঞ্চলিক আর শুদ্ধের দ্যোতনায় গড়া একদম ক্যাজুয়াল দেশীয় পোশাকে এক ছেলে বলে যাচ্ছে তাদের অপমানের কথা তাদের স্বপ্নের কথা স্বপ্ন ভাঙার আওয়াজের আয়োজনের কথা।

প্রবাসী আমি, প্রভিলিজড আমি, না কেঁদে পারিনি। আমার বিশ্বাস এদের কথা যারা বুঝতে চাইবে না, ওদের ভয়েসকে দাবিয়ে দেবে, এদের অপমান করবে, এদের স্বপ্নের সাথে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে, এই অমিত সম্ভাবনাকে ঈর্ষা করবে, তাদের উপর প্রাকৃতিক প্রতিশোধ নেমে আসবে। আসবেই।

উম্মে সালমা
৮/১১/২০২৪

Leave a comment