
আমরা যারা ৯০ এর বাংলাদেশের আবহে বড় হয়েছি রবীন্দ্রনাথ নজরুল বিভূতিভূষন কিংবা হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ে, আমাদের অনেকের কাছে ভালোবাসাটা আত্মিক উপলব্ধির, গোপন, নীরব, গভীর। এটা এমন এক অনূভুতির যাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, স্বার্থপরের মতো দাবী করে করে জানান দিতে হয়না, বরং দ্বায়িত্ব, স্থায়িত্ব, এবং ত্যাগের বিনিময়ে ফুটিয়ে তুলতে হয়।
নজরুলের “ব্যাথার দান” যখন পড়তাম, কি গভীরভাবে আমাদের ভাবিয়ে তুলতো: না পাওয়া ভালোবাসার কষ্টের কথায়। কিংবা হিমু যখন আসবে বলে ও আসতো না, আমরা বুঝতাম, হিমু রুপা কে কি গভীর ভালোবাসে এবং ভাইসভারসা কিন্তু তারা একে অন্যের কাছে আসতে পারে না। কিন্তু তাই বলে ভালোবাসা মিথ্যা হয়ে যায় না। বরং কি এক গভীর অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত ভালোবাসা সম্পর্কগুলো কত সুন্দর! শত না পাওয়ার মাঝে কত টান!
মাঝে মাঝে ভাবি এইসব অতিপ্রাকৃত আয়োজনের মাঝে বেড়ে ওঠাই আমার জন্য কাল হয়েছে। আমার জীবনে বিয়ে সংসারের মাধ্যমে যে নারী পুরুষের স্বাভাবিক আকর্ষনের যাত্রা শুরু হয় তার মধ্যে এইসব কিছুটা ফিলোসফিক্যাল কিছুটা কাব্যময় কিছুটা আত্মিক কিছুটা শব্দহীন ভালোবাসা ঢুকে পড়ে গেছে।
আমি গভীর ভালোবাসতে পারি যে কাউকে কিন্তু যে নদী গভীর বেশি তার বয়ে চলার শব্দ তত কমের মতোই আমার ভালোবাসার প্রকাশ। অতি প্রদর্শনী অতি মুখরতা অতি তরতরানো দেখলে বিরক্ত লাগে এবং লাগতো। এগুলোকে বরাবরই ফেইক মনে হতো। মনে হতো, আরে, যেখানে ভালোবাসা মমতা মায়া আছে সেখানে সম্পর্ক যে কোনো মূল্যে সুন্দর হবেই। আমার সততা আমার বিশ্বস্ততা আমার অনুরাগ আমার আবেগ আমার ভালোবাসার মানুষ এবং মানুষেরা বুঝবেই! আর এইজন্য নিজের ভেতর একটা আত্মসম্মানবোধ সবসময়ই জেগে ছিল।
আমি ভাবতাম, ভালোবাসা শ্রদ্ধেয় এবং শ্রদ্ধার। এখানে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকবে এবং তা থাকবে আত্মসম্মানবোধ থেকেই। মর্যাদাবোধ থেকে।
এবং ব্যাপারটা এমনো মনে হতো যে, যে আমার এই দর্শন এই গভীরতা বুঝতে পারবে না, তার আর কি যোগ্যতা ই বা আছে আমার জীবনের অংশ হবার? সে যদি বুঝতে না পারে, তাকে আমি চাই এবং তার প্রতি আমি বিশ্বস্ত, তাহলে সে আর কি বুঝে ? হতে পারে ভাষার প্রকাশ কম, হতে পারে শব্দের কোলাহল নেই: ঠিক নজরুল যেমন বলেছিলো:
যারে চাই তারে কেবলি এড়াই কেবলি দি তারে ফাঁকি
সে যদি তুলিয়া আঁখি পানে চায় ফিরাইয়া
লই আঁখি
কিন্তু ভালোবাসার এই আত্মসম্মানবোধ নিয়ে আজকাল নতুন করে ভাবতে থাকি। হুড়মুড় করে সোশাল মিডিয়ার আগমন এবং মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের সহজ সুযোগ দেখে মাঝে মাঝে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাই। আপনি স্যোশাল মিডিয়ায় নীরব, ভাবছেন বেঁচে গেলেন? না একদম না। আপনি আপনার ব্যাক্তিগত জীবন ফেসবুকে হাইলাইট করেন না, আপনি বেঁচে যাবেন? একদমই না।
বাস্তব জীবনে এমন কিছু মানুষ এবং ঘটনার সম্মুখীন হতে পারেন, সেখানে আপনি “অসুখী” ” অযোগ্য” ” ব্যর্থ” হিসেবে বিবেচিত হবেন। আপনার গোপন নীরব গভীর ভালোবাসার ফিলোসফি কে তুড়ি মেরে আপনার সঙী আত্মীয় পরিজন কে বাগিয়ে নেয়ার জন্য অথবা আপনার জীবনে বাগড়া দেয়ার জন্য একদল একদম প্রস্তুত।
ভালোবাসা যেখানে আপনার কাছে আত্মসম্মানবোধ তাদের কাছে ভালোবাসা ভালোলাগা মিথ্যা আত্মসমর্পণ। দু’ একদিনের পরিচয়েই গায়ে পড়া, ইনিয়ে বিনিয়ে মিষ্টি মধুর করে কথা, মিষ্টি নামে ডাকা, ঘন ঘন ফোন করা, মেসেজ পাঠানো, গোপন ব্যক্তিগত সুখ দুঃখের কথা শেয়ার করা…আর এসবের ফাঁকে ফাঁকে আপনি দেখতে পাবেন এরা কেমন করে আপনার জীবনসঙ্গী/পার্টনার/ ভালোবাসার মানুষের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। তখনি আপনি দেখবেন আপনার চেনা মুখ নতুন রঙ নিচ্ছে এবং ভাবছে, “আরে, ওতো কখনো আমার কাছে এত আত্মসমর্পণ করেনি, এমন করে আমার হাতের মুঠোয় আসেনি? এমন করে আমাকে প্রশংসা করেনি? এতো আমার সবকিছু নতুন করে পাওয়া।” তখন সে কিন্তু নিমিষেই ভুলে যেতে পারে আপনার দার্শনিক ভালোবাসা কে।
জানি এসব সব ঠুনকো, লোক দেখানো, শয়তানের ওয়াসওয়াসা এবং শেষ মেষ জঘন্য অপরাধ, তবুও এসব দেখে দেখে নতুন করে ভাবতে থাকি, ভালোবাসা সম্পর্ক মমতা মায়া এসব আসলে কি? এসব কি আত্মসম্মানবোধে মোড়ানো একটি সুন্দরের নাম না লজ্জা শরম বিহীন লোক দেখানো আত্মসমর্পণ? কোনটা আসলে ভালো? ভাষাহীন ভালোবাসা না মোহময় শব্দের বেসাতি? নাকি ভালোবাসার কোন অস্তিত্ব নেই, সব শরীরের খেলা: হরমোনের প্রভাব। মন বলে কিছু নেই। নারীর পুরুষ হলেই হয়, পুরুষের নারী। ব্যাক্তি এখানে তুচ্ছ!
জানি না, জানতে চাই না তবে কেন যেন মনে হয়, যত যাই হোক, দুনিয়ার যত পরিবর্তন আসুক, ভালোবাসার মায়ার মমতার শক্তি আর সততা সাময়িক ভূপাতিত হলেও তার মৃত্যু নেই ক্ষয় নেই পরাজয় নেই। সত্য তো চকচকে হয় না, সত্য হয় দৃঢ় ক্ষয় লয় বিহীন।সৎ মানুষের জীবনের সফলতা ওখানেই।
উম্মে সালমা, ২৫/০৬/২০২৫
