CHATGPT কিংবা এরকম কিছু AI নিয়ে একাডেমিক মহলে একটা হৈচৈ চলছে। তবে উন্নত বিশ্বের হৈচৈ এখন অনেকটা বিশ্লেষণ আর পলিসির পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং কিভাবে শিক্ষায় AI অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ হয় এ নিয়ে পরিস্কার দিকনির্দেশনা দেয়া হচ্ছে এবং সেই সাথে এই দিকনির্দেশনা না মানার ফলাফল শিক্ষার্থীদের মানতে এবং বহন করতে হচ্ছে। AI এর উপযুক্ত ব্যবহার নিয়ে ও চলছে নানা প্রশিক্ষণ কর্মশালা যাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এবং গবেষকরা নিজেদের হিউম্যান পটেনশাল সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে পারেন।
AI এর ব্যবহার নিয়ে একটি এনালোজি প্রশ্ন আকারে বার বার আমাদের সামনে আসে। যেমন, আপনি কি এমন বিমানে চড়বেন যে বিমানের পাইলট তার কোর্সে প্রতিটি আসাইনমেনট AI দিয়ে প্রস্তুত করতো? এরকম পাইলট কি আসলেই বিমান চালনার জন্য দরকারি সব স্কিল অর্জন করতে পারে? তার হাতে যাত্রীরা কতটুকু নিরাপদ?
কিংবা আপনি কি এমন ডাক্তারের কাছে যাবেন যে পড়ালেখা না করে সবকিছু AI CHATGPT দিয়ে করিয়ে ডাক্তারী পাশ করে রোগীর চিকিৎসা সেবায় নেমেছে? এই ডাক্তার কি বুঝবেন সঠিকভাবে কি হচ্ছে কেন হচ্ছে? তার নিখুঁত আসাইনমেনট কিংবা উচ্চ নম্বর কি রোগীর উপকার করবে?
ব্যপারটা ভাবনার এবং মজার। আপনি হয়তো বলবেন, ওকে ক্রিটিক্যাল সেক্টরে AI-induced শিক্ষাপদ্ধতি চলবে না। বাকিগুলোর কি সমস্যা? AI কে বললে একটা আর্টিকেল লিখে দেবে, একটি বুক রিভিউ করে দেবে, একটা এচে লিখে দেবে, এবং এভাবে কবিতা গল্প উপন্যাস সব সব…তো!
তো আপনার কাছে একটা প্রশ্ন, আপনি তাইলে কি জন্য আছেন এখানে? আপনার কাজ কি? একটা রোবট কি আপনার রিপ্লেসমেন্ট?
ইমোশনাল প্রশ্ন আপার্ট, আসলে কি AI CHATGPT উপরে উল্লেখিত কাজগুলো আপনার মতো করে করে দেবে? আমার অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান হলো, না করে দেবে না। এই রোবট তা পারে না।
আপনারা যারা এগুলো নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন তারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, CHATGPT এর সমস্যা এবং লিমিটেশনগুলো:
১. সে কোন টপিকসের সুক্ষ, গভীর, এবং চিন্তাশীল বিষয়গুলো ধরতে পারেনা। যেমন, আপনি একটি আর্টিকেলের সামারি দিতে বললেন, সে ভাসা ভাসা কিছু আইডিয়া দিতে পারে কিন্তু মূল যে কম্প্রিহেনসিভ আইডিয়া সেটা দিতে পারে না। এখানেই গবেষকরা থমকে দাঁড়ায় এবং বিরক্ত হয়। এবং কেউ যদি এভাবে কিছু প্রডিউস করে জমা দেয়, আমি ক্লিয়ারলি বুঝতে পারি এটা CHATGPT লিখেছে এবং সেজন্য কোন ডেপথ নেই।
২. সে অনেক সময় খুব ডিসেপ্টিভ। বিশেষ করে সোরস এবং রেফারেন্সের ব্যাপারে। যেমন, ধরেন আপনি একটা লেখার কমান্ড দিয়েছেন, সেটা লিখতে গিয়ে সে পর্যাপ্ত পরিমাণে রেফারেন্স পাচ্ছে না বা অনেক জটিল আইডিয়া ( যেমন Michel Foucault দিয়েছে) পেনিট্রেট করতে পারছে না, তাইলে সে এক সোরসের সাথে আরেকটি লাগিয়ে মিথ্যা একটা রেফারেন্স দিয়ে দেবে। নতুবা নিজের মতো রেফারেন্স বানাবে। এগুলোকে বলা হয়, confected আইটেম। তো এটা এই বস্তুকে unreliable করে ফেলেছে।
৩. ChatGPT র ভাষা খুব লিমিটেড এবং মেকানিকেল। এর কিছু ভোকেব আছে ব্যস! যা-ই লিখবে ওগুলো দিয়ে ই লিখবে। তাই ওর ভাষা খুব মোনোটোনাস। তাই এর ব্যবহার একজন শিক্ষার্থীর একজন লেখকের (যে কোনো বিষয়ে লেখাকে) মনোটোনাস করে তোলে।
৪. আপনি একে দিয়ে কবিতা লিখাতে পারবেন। কিন্তু এতটা ড্রাই আর মমতা হীন পাবেন যে আপনার কবিতা জিনিসটার উপর মন উঠে যাবে। যেমন, আপনি যদি নিজচোখে একটি জায়গা দেখেন আর তারপর তাকে নিয়ে ওকে লিখতে বলেন, আপনি যা দেখেছেন সে কোনদিন সেটা লিখতে পারে না। সে কিছু গাছপালা আর প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা বলে ক্ষান্ত দেবে। যে কোন ক্রিয়েটিভ কাজে সে ইমোশানাল ইন্টেলিজেন্স আনতে পারে না।
৫. আপনি তার কাজে বিরক্ত হয়ে যতবার কমান্ড দেবেন ঘুরে ফিরে সে একি জিনিস নানা ভাবে আপনাকে দেবে। পরে সব মিলিয়ে দেখবেন তার এরিয়া একটি সীমানায় বন্দী।
এসব কিছু ভাববার বিষয়। খুব ভাববার। আমি/আমরা কি শিক্ষায় গবেষণায় সৃষ্টিতে আমাকে/আমাদের দেখতে চাই? না একটি রোবটকে দেখতে চাই? একটি রোবট কি আমার সহযোগী হবে না আমার অল্টারনেটিভ/ আমার ছায়া/ আমার কাউন্টার-সেলফ হবে?
আমার ক্ষেত্রে “আমি” ( sense of self) খুব গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করেছেন যে বৈশিষ্ট্য দিয়ে সেগুলো নিয়েই এই আমি। আমি এই “আমি” কে ইকসপ্লোর করতে চাই।
তাই CHATGPT আমার কাছে অন্যকোন অনলাইন টুলস থেকে বেশি কিছু না। আমি একটি ভ্যাকুয়াম মেশিন যেমনে ব্যবহার করি, একেও এমনে ব্যবহার করতে চাই। এটা যেগুলো পরিস্কার করতে পারে না, আমি অন্যভাবে অন্যকিছু দিয়ে পরিস্কার করি। আমার কাছে মানুষের emotional agency, capabilities, and intelligence নাম্বার ওয়ান। সেগুলো খাটিয়ে বুদ্ধিভিত্তিক এবং সৃষ্টিশীল হবার বিকল্প নেই।
কিন্তু একে কিভাবে ব্যবহার করা যায়? প্রথমে যে বিষয়টি আমাদের মনে রাখতে হবে ChatGPT এবং সমরূপ AI tools নিয়ে সেটা হলো, বিজ্ঞানের এই অভূতপূর্ব অগ্রগতি এবং ওয়াল্ড ওয়াইড প্রযুক্তি পৌঁছে দেয়ার মতো কানেক্টিভিটি আমাদের সময়ের বাস্তবতা। এই বাস্তবতা আমাদের সত্যি খুব চমৎকৃত করে এবং জীবন অনেক সহজ করে । কিন্তু এই বাস্তবতা আমাদের যেন অন্ধ না করে এই সতর্কতা এবং সচেতনতা এই সময়ে খুব জরুরী। তাই AI tools কে আমরা যেমন অন্ধের মত অনুসরণ করতে পারিনা তেমনি তাকে ছুড়ে ফেলেও দিতে পারিনা।
তাহলে তাকে কিভাবে ব্যবহার করতে পারি?
১. লেখার সহযোগী হিসেবে: ধরুন একটা জটিল আইডিয়া আপনার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কিন্তু আপনি একে কাগজে কলমে পিন ডাউন করতে পারছেন না। আপনি আপনার প্রাইমারি আইডিয়াটা তাকে লিখে দিলে সে মোটামুটি একটি সাজানো একটা আইডিয়া দিতে পারে। তখন আপনি সেই আইডিয়াকে আপনার মতো একসপানড করতে পারেন। নতুন নতুন আইডিয়া যোগ করতে পারেন। সংশোধন এবং বিয়োজন করতে পারেন। কোন কিছু লেখার যে অব্যাহত টেনশন সেটা থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে পারেন।
২. এই সব করার সময় আমাদের মনে রাখতে হবে আমি ওর আইডিয়া নিচ্ছি আমার প্রয়োজন অনুযায়ী, কিন্তু আমি ওর ভাষা নিচ্ছি না। তো আপনার লেখার পরবর্তী স্টেপ হলো আপনার লেখার ভাষা আপনার করে তোলা। ChatGPT র রোবোটিক, বোমবাস্টিক, এবং মনোটোনাস ভাষা বাদ দেয়া, সংশোধন করা, পরিমার্জিত, এবং পরিশীলিত করা। চ্যাটজিপিটির কথা আপনার যতৈ সুন্দর লাগুক, আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, আপনার লেখা আপনি যখন একটু সময়ের গ্যাপে পড়বেন আপনি নিজেই মুগ্ধ হবেন, ” আরে, এটা আমি লিখেছি?”
৩. যে কোন তথ্যে nuances and details এড করা। যেমন, আপনি একটি আর্টিকেল রিভিউ করতে দিলেন, ChatGPT আপনাকে জেনারেল একটা ধারণা দিলো কয়েক প্যারায়। আপনি এটা এবং মূল লেখা পাশাপাশি রাখুন এবং মূল লেখা পড়তে থাকুন। এরপর মূল লেখার গভীর আইডিয়াগুলো জেনারেল কথাগুলোর সাথে incorporate করুন। এটুকু কষ্ট তো করতেই হবে না হলে লিখবেন বা শিখবেন কিভাবে?
৪. আরেকটি সুন্দর জিনিস ChatGPT করতে পারে সেটা হলো কমান্ড অনুযায়ী টেবল বানানো। আপনি টেবিল বানিয়ে সেটা আপনার মতো করে আবার সাজিয়ে নিতে পারেন। তবে হ্যাঁ, বিজ্ঞান গবেষণার নানারকম গ্রাফ আঁকতে পাওয়ার পয়েন্ট বা ম্যাটল্যাব ভালো।
৫. টুরিস্ট গাইডেনস ভালো দিতে পারে ChatGPT. যেমন আপনি এমন দেশে ঘুরতে যাবেন যার তথ্য তার কাছে আছে। সে সুন্দর করে একটি ইটিনারি দেবে কোথায় যাবেন কেমনে যাবেন কোথায় থাকবেন ইত্যাদি। কিনতু তারপরও মানুষের সাহায্য নিতে ভুলবেন না!
৬. ট্রান্সলেশন কাজে ব্যবহার করা যায়। তবে সে ভাষাগত (ভাবগত নয়) অনুবাদ করে। ফলে সেক্ষেত্রে আপনার ইনটারভেশন জরুরি। সরাসরি তার ইনপুট ব্যবহার রিস্কি। আমি বাংলায় একটি সরকারি চিঠি সময় বাঁচাতে ওকে অনুবাদ করতে দিয়েছিলাম। সে করতে পারেনি। পরে আবার নিজেকে বসে সরকারী terminology তে দক্ষ ব্যক্তির সহযোগিতা নিয়ে সেটা অনুবাদ করে জমা দিতে হয়েছে।
৭. পৃথিবীর যাবতীয় দেশের যাবতীয় তথ্য তার কাছে নেই। আপনি যদি থার্ড ওয়ার্ল্ড সম্পর্কে লেখালিখি গবেষণা ইত্যাদি করেন, সে আপনাকে খুব কম সহযোগিতা করতে পারবে। আমি বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়া বিষয়ক বিশেষ কিছু বিষয়ে (যেমন মোঘল আমলের জীবন) অনেক কিছু কমান্ড দেয়ার পর সেখানে ভালো কিছু পাইনি। পরে বুঝলাম ওগুলো ওকে ইনপুট দেয়া হয়নি। আসলে এখন পর্যন্ত টেকনোলজিক্যালি ডেবেলভপট পৃথিবী এবং তার জ্ঞানভান্ডার AI এর মূল মস্তিষ্ক। ওকে এই সংক্রান্ত কাজে ইনফরমেশন এর জন্য ব্যবহার করা যায়।
সবচেয়ে বড় কথা হলো ChatGPT শিক্ষা গবেষণায় সৃষ্টিতে একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে কিন্তু মূল ভূমিকা নয়। সে আমাদের জীবন সহজ করতে পারে কিন্তু মূল কাজ আমাদের করতে হবে। কারণ আমাদের যুগ হলো তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং প্রাপ্তির যুগ। তথ্য জ্ঞান নয়: knowledge and information are far different from each other। জ্ঞান তথ্যের স্তুপ থেকে বিচার বিবেচনা আলাপ আলোচনা বিশ্লেষণ পরিমার্জনায় অর্জন করতে হয়। মানুষ তাই ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স এবং এজেন্ট।
উম্মে সালমা, ১২/০১/২০২৪