Cultures, Reflections

কিছু কথা বলে যাই

আমার বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় ফ্লোরে একটি অষ্ট্রেলিয়ান পরিবার থাকে। আমি যখন প্রথম এখানে আসি তখন থেকেই তাদের দেখি। তারা তখন কাপল ছিলেন: মেয়েটা একটা মিউজিক স্কুলে গান শেখাতো এবং তার হাজবেন্ড জব করতো, এখনো করে। আমার সাথে একদিন পরিচয় হয় এবং মাঝে মাঝে কথা হতো। এর মাঝে যখন করোনা শুরু হলো একদিন দেখি মেয়েটা প্রেগন্যান্ট। আর এভাবেই গত চার বছরে তিনি তিনটি ফুটফুটে মেয়ের মা হয়েছেন। প্রথম প্রেগন্যান্সির সময় থেকেই তিনি বাইরে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। গত চার বছর তার স্বামী ভদ্রলোক সংসার চালান, উনি ভাতা পান, এবং পুরো সময়টা বাচ্চাদের লালন পালনে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। আমি প্রায়ই দেখা হলে উনার সাথে এবং বাচ্চাদের সাথে কথা বলি। আমি সারাদিন দেখি তিনি কি পরিশ্রম করেন বাচ্চাদের নিয়ে: তাদের বাইরে হাঁটতে নিয়ে যান। বিকেলে খেলতে নিয়ে যান। বড়টাকে হাটিয়ে বাকি দুটিকে প্রামে বসিয়ে কত কাজ করেন। একদিন আমি তাকে খুব এপ্রিশিয়েট করলাম তার মায়ের দায়িত্ব পালনের জন্য এবং দেখলাম সে ভীষণ রকম খুশি হয়েছে।

আমি জানি বাঙুল্যানডের অনেক নারীবাদী এটা শুনে হাহা করে উঠবে এবং এই নারীকেও “অপ্রেসড” “ভিকটিম” বলে চালিয়ে দেবে…ঘর মানেই যখন জেলখানা তখন সেখানকার বিরানীও তাদের কাছে বিষতুল্য… কিন্তু আমি যা দেখি এই উদাহরণে তা হলো একমুখী কাজের ব্যবস্থা এবং স্বীকৃতি। আমি যদি আমার বাচ্চা হোয়া এবং বাচ্চা পালনের সময়ে এই সুবিধা পেতাম আমি লুফে নিতাম। কেউ যদি এসে আমাকে বলত, আপনি পাঁচ ঘন্টা কাজ করে আট ঘন্টার বেতন পাবেন আমি ধেই ধেই করে নাচতাম পারলে আমার মেয়েদের নিয়ে…

ঠিক একারণেই আমীরে জামায়াতের নারীদের নিয়ে বক্তব্য শুনে সত্যিই চোখে পানি চলে এলো। পুরুষ জাতি যারা এটা নিয়ে হাসাহাসি করছেন, ফেসবুক উড়ায়ে ফেলছেন, তাদের আমার করুণা হয় তাদের শিক্ষা দীক্ষা নিয়ে আরো করুণা হয়… অবশ্য নারীদের দুই নৌকায় পা দিয়ে ভাগ হতে দেখে, বাচ্চা চাকরি সব নিয়ে নাকের পানি চোখের পানি এক হতে দেখে, অভিভূত হয়ে তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়ে দু এক কলম লেখা কিংবা রাস্তায় নামাও একটি পলিটিক্স। এই পলিটিক্স আজ পর্যন্ত দেশে কোন সমস্যা সমাধান করতে পেরেছে একটা দুইটা উদাহরণ দিতে পারেন?

আমীরে জামায়াতের বক্তব্য শুনে বিশেষ করে মায়ের কষ্টের যে গভীর সাহিত্যিক বর্ণনা তা শুনে আমার চোখে পানি চলে এলো কারণ আমি আমাকে সেখানে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার বিশ্বাস যত নারী মা হয়েছে সবাই তাদের নিজেদের দেখতে পাবেন সেই বর্ণনার ছবিতে।

যারা আমায় চেনেন, জানেন, আমি যখন মা হয়েছি তখন আমি স্টুডেন্ট এবং তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমি পড়াশোনায় বরাবরই ভালো ছিলাম এবং পড়ুয়া ছিলাম বলে আমি কখনো ই সংসারের জন্য ক্যারিয়ার কম্প্রোমাইজ করতে রাজি ছিলাম না। আমার মত মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছিলো a dream come true । কিন্তু ঠিক এই সময়ে আমার একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য সংখ্যা দশজন। ঠিক কিভাবে নিজের পড়াশোনা চাকরি এবং সংসার চালিয়ে নেবো এটা ছিলো আমার জন্য যুদ্ধ। প্রতিদিন কি রান্না করবো কি খাবো কি খাবে সবাই এই চিন্তা করতে করতে মাঝে মাঝে মনে হতো পাগল হয়ে যাবো। সবাই সহযোগিতা করার পরো মাঝে মাঝে মনে হতো এইখানে হাল ছেড়ে দিই। আর না!

কিন্তু “আচ্ছা আরেকটু চেষ্টা করে দেখি” করতে করতে চতুর্মাত্রিক কাজ করতে করতে কখন যে শরীরের ভেতর নানা অসুখের বীজ বপন হয়ে গেল বুঝতে ই পারিনি। অসুখ তো হবেই ঠিকমতো মায়ের যত্ন না হলে মা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া আর বিশ্রাম না নিলে অসুস্থতা অনিবার্য। আপনারা যারা আজকের লেখা পড়ছেন তারা হয়তো ভাবছেন, আল্লাহ, আপুর হাজবেন্ড কতো সহমর্মী এবং সহযোগী! তাদের বলছি, বাংলাদেশের পারিবারিক এবং সামাজিক সেটাপে একজন পুরুষ যতৈ পরিবারমুখী হন তার বাউন্ডারি ডিফাইনড। তাকে সেই বাউন্ডারি মানতে হয়। তাছাড়া তার নিজের জীবন আছে কাজ আছে। স্ত্রীরা নিজের প্রতি যত্নশীল না হতে পেরে বাচ্চাদের লালন পালনে শরীরের ক্ষয় হবার যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তাতে তারো বেশি কিছু করার থাকে না শুধু প্রতিদিন ঘ্যান ঘ্যান করে বলা, “প্লীজ একটু বেশি বেশি খাও।” “নিজের যত্ন নাও।”

আমার আয়েশ করে খাবার সময় কোথায় ছিল? সকাল সাড়ে সাতটায় বেরুতে হলে কখন ঠিক নাস্তা করতে হয়? আর আয়েশী নাস্তা করতে হলে ঠিক কিভাবে কাজের রুটিন সেট করতে হয়: ১. ফজর নামায, অল্পকিছু ইবাদত: ২. দিনের রান্না আয়োজন ৩. সকালের খাবারের আয়োজন; ৪. বাচ্চাদের কাজ (দুধ খাওয়ানো, বিছানা বদলানো, তাদের পরিস্কার করা, আরো কত কি!)–পাঁচটা থেকে সাড়ে সাত কি এত সবের জন্য যথেষ্ট? তো ইমপ্যাক্ট গিয়ে পড়তো খাওয়ার উপর। কোনরকম কিছু মুখে দিয়ে দৌড়ানো। এই করে করে যখন অনেক অনেক অসুস্থ হয়ে পড়লাম আমার এক খুব চমৎকার ভাবী, একদিন দুঃখ করে বলেছিলেন, “ভাবী কাজ করতে করতে শরীর একদম জ্বালিয়ে ফেলেছেন।” আমার চোখে পানি চলে এসেছিল, আমার পড়াশোনা ক্যারিয়ারের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে কি জীবন অন্যরকম হতো?

অষ্ট্রেলিয়ার কাজে সিস্টেম এবং আমীরে জামায়াতের বক্তব্য আমার এই প্রশ্নের উত্তর। না ক্যারিয়ার ছেড়ে দেয়া কিংবা সংসার কোন সমাধান নয়। সমাধান হলো ইকুইটি (equity)। সমাধান হলো রাষ্ট্রের নাগরিকদের যার যার অবস্থান অনুযায়ী উপার্জনের সুযোগ এবং সুবিধা। কেয়ারিং রেসপনসিবিলিটি একটি বড় রেসপনসিবিলিটি। উন্নত দেশগুলোতে এর পুরোপুরি স্বীকৃতি আছে। যেমন সেদিন জানলাম হাজব্যান্ডের হঠাৎ মৃত্যুতে আমার এক কলিগ ছুটিতে চলে গেছেন এবং তিনি ভালো বোধ না করা পর্যন্ত কাজে আসবেন না। নিশ্চয়ই এমন ছুটির ব্যবস্থা আছে যিনি এই সময়ে এটা ব্যবহার করতে পারবেন।

তাহলে মায়েদের পাঁচ ঘন্টা কর্মদিবসের সমস্যা কোথায়? কম কাজ করে বেশি বেতন পাবেন এর সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো মনে। বাঙালি মুসলমান সমাজ এমন মনস্তাত্ত্বিক কনসটিপশনে ভুগছে যে যেখানে সারাদিন কাজ করার পরো, জামাই বলে, ” সারাদিন তো বাসায় থাকো, সারাদিন কি করো?” “চাকরিতো আমি ও করি, তোমার খারাপ লাগছে কেন?” “তুমিতো একা না, দেখো বহু নারী আজকাল ঘর বাহির সামলায়, তোমার সমস্যা কেন?” সেখানে নারীরা কম কাজ করে বেশি বেতন পাবেন সমাজের ঐ শ্রেণীর এবং একশ্রেণীর জন্য এটা ঠিক আরামের না। কোনদিন যেন আবার পুরুষদের এক অংশ বলে বসে, আসুন আমরা সবাই নারী হয়ে যাই। এটাই ভয়।

এই ভয় অমূলক নয়…আইআইইউসিতে চাকরি করার সময়ে, আমার সম্মানিত পুরুষ কলিগদের মাঝে মাঝে চিৎকার চেঁচামেচি করতে দেখতাম। তারা চিৎকার করে বলতো, ডিপার্টমেন্ট মেয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেবে না। এদের নিলেই সমস্যা। আজকে বিয়ে কালকে প্রেগন্যান্ট পরশু বাচ্ছা অসুস্থ… ডিপার্টমেন্ট কেমনে চলবে? এরা আছে আরামে… এদের ছুটি আর ছুটি। আবার এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন, উনার কাছে ছুটির দরখাস্ত নিয়ে গেলে, দুচার কথা শুনিয়ে দিতেন। আবার রসিয়ে রসিয়ে পাঠান মেয়েদের গল্প বলতেন, এরা নাকি প্রসব বেদনা উঠলে ঝুড়ি নিয়ে বনে চলে যেত আর নিজে নিজে বাচ্ছা হোয়ায়ে বাচ্চা নিয়ে ঘরে চলে আসতো। আবার গর্ব করে বলতেন, তার এতগুলো সন্তান, তার ওয়াইফ তো তার কাছে কখনোই ছুটি চায়নি? তাইলে আমাদের কেন লিভ লাগে?

আমীরে জামায়াত আপনি খুব সুন্দর সহজ এবং কার্যকর রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা বলেছেন। আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু আপনি কি খসড়া কমিটি গঠন এবং নারীবিষয়ক চিন্তা এবং গবেষণার কোন সেল গঠন করেছেন? যারা আপনাকে বাংলাদেশের আপামর নারীদের একটি চিত্র দেবে এবং সেই অনুযায়ী আপনি একটি রিয়েলিসটিক এবং এপ্লিকেবল নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারবেন?

তবে একজন ক্ষুদ্র নারী হয়েও আপনাকে বলবো, প্লীজ শুরুটা জামায়াতের ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে হোক, যেখানে নারীদের চাপিয়ে রাখাই সিস্টেমের নর্ম। সেই সিষ্টেম ভেঙে দিন এবং সেগুলোকে মডেল করে দেশবাসীকে দেখিয়ে দিন, এটা হবে ভবিষ্যতের নারীবান্ধব বাংলাদেশ।

উম্মে সালমা, টুঅং, ১৩/১১/২০২৫

Cultures, Reflections

বৈশাখী ভাবনা

ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কবি পারসিবিসি শেলীর “Ode to the West Wind” কবিতাটা কম বেশি সবারই পড়া এবং জানা। কবি তার এই কবিতায় কিভাবে ইংল্যান্ডের পশ্চিমা বাতাস পুরোনো প্রকৃতির সবকিছু পরিবর্তন করে নতুনদের সূচনা করে, সেটা দেখিয়েছেন আর সেই বাতাসকে যে বসন্তের বোন তাকে বলেছেন তাকেও জাগতিক সমস্ত দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করতে।

পশ্চিম বাতাসের ছোঁয়ায় তিনি যেন ভুলে যান অতীতের সব কষ্ট আর নতুন উদ্যমে জীবনকে চেনেন এই ভেবে যে, শীত আসলে বসন্ত কত ই বা দূর (If Winter Comes Can Spring be far behind?)। তিনি এই প্রাকৃতিক উপাদানকে বলেন তার বৈশিষ্ট্য তাকে দিতে যেন তার লেখা দিয়ে তিনি সারা পৃথিবীতে শান্তির আর সাহসের বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারেন।

কবিতাটির অসম্ভব সুন্দর বৈশিষ্ট্য হলো পশ্চিমা বাতাস কি কি পরিবর্তন আনে কিভাবে পরিবর্তন আনে তার বিশদ বিবরণ। তার একটি হলো এই বাতাস যখন ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বইতে শুরু করে গাছের সব পুরোনো পাতা ঝরতে শুরু করে। কবি বলেছেন, পাতাগুলো এখন রুগ্ন। তারা হয়ে পড়েছে হলুদ, কালো, মরচে লাল, ধূসর । পশ্চিমের বাতাস তাদের উড়িয়ে বেড়ায় আর তার সাথে ফল ফুলের বীজগুলোকেও, পাতা পচে মরে যায় কিন্তু বীজগুলো ঘুমিয়ে পড়ে মাটিতে যতক্ষণ না বসন্ত আসে, তাদের কাঁপিয়ে জাগিয়ে দেয়া বসন্ত…

পুরো বর্ণনা আমাদের সামনে তুলে ধরে ঋতু পরিবর্তনের খেলা: এক ঋতু চলে গেলে আরেক ঋতু আসে, হেমন্তের পর শীত তারপর বসন্ত … প্রকৃতি ধূসর মৃত হতে জেগে উঠে নতুন রুপে নতুন ফল ফসল নিয়ে।

বৈশাখ এলেই এই কবিতা আমার মনে পড়ে যায়। আমি ভাবতে থাকি বাংলাদেশের ঋতু পরিবর্তনের খেলায় বসন্তের বৈশাখে কি কি পরিবর্তন আসে! আমের মুকুল বড় হতে থাকে, কাঁঠালের গায়ে কাঁটা বড় হতে থাকে…এদিকে ফসল তোলা হয়ে গেছে। কৃষকের মনে আনন্দ। খাজনা আদায়ের পরো গোলা ভরে যাবে ধানে । সামনের কয়েকটা মাস আর চিন্তা নেই। তখনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়নি তখনো নিষ্ঠুর জমিদারের হাতে বন্দী হয়নি আয়ের এবং আনন্দের উৎস “ফসল”।

তাইতো বাঙালি মুসলমানের ঘরে ঘরে আনন্দের বন্যা বয়ে যেতো। কৃষকেরা কৃষাণির মায়ার হাতে তৈরি করা পান্তা ইলিশ ভর্তা দিয়ে এবং পিঠা পুলি খেয়ে খাজনা দিতে যেত আর মেতে উঠতো নানারকম মেলায় খেলায়: নৌকা বাইচ, দাড়িয়াবান্ধা, কুস্তি প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। এই উপলক্ষে বসতো মেলা: ঘরের যাবতীয় সব তৈজসপত্র আর বাহারী কসমেটিকস আর সাজসজ্জার উপকরণে। আসতো নাগরদোলা আরো কত কি!

এসব উদযাপনে তো এই মাসকে পূজা, প্রকৃতি পূজা, ধারণার পূজা, বিরোধী পক্ষকে অপরায়ণ এসব ছিলোনা। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে শীত গিয়ে বসন্ত গিয়ে নতুন ফল ফসলের গোলা ভরার যে বার্তা আজকের ব্যবসা বাণিজ্য চাকরিতে ব্যাংক ব্যালেন্সের মতো। খাজনা প্রদান আজকের ট্যাক্স দেয়ার মতোন। কে না খুশী হয় আয় ব্যয়ের সামঞ্জস্যে এবং দিন শেষে তার সঞ্চয়ে লাভে মুনাফায়? আর এই প্রাপ্তি পরিশ্রমী কৃষক কৃষাণি জীবনের অনিবার্য অনুসঙ্গ ছিল বলেই বৈশাখের দিনগুলো তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ‌

সময়ের বিবর্তনে যারা একে বিশেষ ধর্মের এবং বিশেষ রাজনীতির রুপ দিয়েছে এবং যারা একে ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কারণে প্রত্যাখ্যান করেছে দুটো অংশ ই প্রান্তিক। প্রথম গোষ্ঠী হলো আদর্শের দিক দিয়ে চরমপন্থী, প্রোপাগান্ডামুখী এবং ইসলামোফোবিক। এরা সংস্কৃতির সব উপাদানকে তাদের রাজনৈতিক রঙ দেয় এবং হাতিয়ার বানায়। এই কাজটি করতে গিয়ে সাংস্কৃতিক অথেনটিসিটি কিংবা ডাইভার্সিটি চাপা দিয়ে মারে। বাংলাদেশের সংস্কৃতির মার্জিত উপাদানগুলোকে হাইজ্যাক করে। করেছে।

অন্যদিকে বৈশাখ-পরিত্যক্ত অংশ ধর্ম এবং সংস্কৃতির যোগাযোগ অস্বীকার করে এবং এই দুটোর কথোপকথন কেমনে হয়, কেমনে মানুষের সুকুমার বৃত্তির চর্চা করতে হয়, কেমনে ধর্ম আর জীবন যাপন পারমিউটেশন কম্বিনেশন করতে হয় এরা এসব নিয়ে ভাবতে চায় না। ভাবে না। জীবন ধর্ম মানুষ সমাজ সংস্কৃতি চারপাশ এদের কাছে কিছু রিচুয়্যালে বাঁধা। এর বাইরে সব “নিষেধ”, সব “হারাম।”

হ্যাঁ বৈশাখের আধুনিক শহুরে এলিটশ্রেণীর ক্যাপাটালিষ্ট এবং কনজিউমারিষ্ট কালচারাল দিক সমালোচনার যোগ্য। আচ্ছা বৈশাখ এলেই আপনাকে কেন নতুন শাড়ি পাঞ্জাবি কিনতে হবে? কেন শাদা লাল ই পড়তে হবে? কেন ইলিশ ভর্তা পান্তা খেতে হবে? কেন সব জিনিস চড়া দামে বিক্রি হবে? এই বাজার বাজেট কাদের সৃষ্টি এ নিয়ে আলাপ যৌক্তিক । কিন্তু ঋতু পরিবর্তনের যে এপিল গ্রামীণ জীবনের যে ইতিহাস ঐতিহ্য নষ্টালজিয়া তাতো এসব ফলস ফিলোসফির এবং তার প্র্যাকটিসের জন্য মিথ্যা হয়ে যেতে পারে না!

এই ইতিহাস ঐতিহ্য নষ্টালজিয়ার চর্চাই আমাকে আকৃষ্ট করে। আমি খুঁজি এর থেকে আমাদের আত্মপরিচয়ের কি বার্তা আছে । খাওয়া দাওয়া পোশাক আশাক গাল গল্পের চকচকে অন্তঃসারশূন্য খোলসের আড়ালে “সত্যিকারের বৈশাখ” খুঁজতে থাকি। এমন বৈশাখ যেখানে আমার পূর্ব পুরুষদের গন্ধ। এমন বৈশাখ যেখানে আমার শিকড়ের চাষবাস। এই চাষবাস একদিনের নয়। একদিনের জন্য নয়।

এটা বোঝার জন্য যে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদেরো ইতিহাসের পুনঃপাঠ এবং সেই সাথে পজিটিভ পরিবর্তনের সুযোগ আছে। বৈশাখীর উষ্ণ বাতাসে দানবীয় শক্তিকে উড়িয়ে দেয়ার মতো উপমার দরকার আছে। রক্তাক্ত অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভালোর পথে গঠনের পথে এগিয়ে যাবার শিক্ষা নেয়ার দরকার আছে।

আর কতকাল বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলবে? কতকাল আমরা শুধু একটা বন্যা আর জলোচ্ছ্বাসের দেশ হয়ে থাকবো? আর কতকাল আমাদের সম্পদ লুট হবে?

আমাদের ফল ফসলের দিন আসুক, আমাদের লুট হয়ে যাওয়া গোলাগুলো আবার সম্পদে ভরে যাক। ঘরে বাইরের সব বর্গী নিপাত যাক। বৈশাখ হয়ে উঠুক সত্যিকারের অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সামাজিক যোগাযোগ, এবং শান্তি স্বাধীনতার প্রতীক।

উম্মে সালমা, ১ এপ্রিল ২০২৪.