Cultures, Reflections

কিছু কথা বলে যাই

আমার বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় ফ্লোরে একটি অষ্ট্রেলিয়ান পরিবার থাকে। আমি যখন প্রথম এখানে আসি তখন থেকেই তাদের দেখি। তারা তখন কাপল ছিলেন: মেয়েটা একটা মিউজিক স্কুলে গান শেখাতো এবং তার হাজবেন্ড জব করতো, এখনো করে। আমার সাথে একদিন পরিচয় হয় এবং মাঝে মাঝে কথা হতো। এর মাঝে যখন করোনা শুরু হলো একদিন দেখি মেয়েটা প্রেগন্যান্ট। আর এভাবেই গত চার বছরে তিনি তিনটি ফুটফুটে মেয়ের মা হয়েছেন। প্রথম প্রেগন্যান্সির সময় থেকেই তিনি বাইরে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। গত চার বছর তার স্বামী ভদ্রলোক সংসার চালান, উনি ভাতা পান, এবং পুরো সময়টা বাচ্চাদের লালন পালনে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। আমি প্রায়ই দেখা হলে উনার সাথে এবং বাচ্চাদের সাথে কথা বলি। আমি সারাদিন দেখি তিনি কি পরিশ্রম করেন বাচ্চাদের নিয়ে: তাদের বাইরে হাঁটতে নিয়ে যান। বিকেলে খেলতে নিয়ে যান। বড়টাকে হাটিয়ে বাকি দুটিকে প্রামে বসিয়ে কত কাজ করেন। একদিন আমি তাকে খুব এপ্রিশিয়েট করলাম তার মায়ের দায়িত্ব পালনের জন্য এবং দেখলাম সে ভীষণ রকম খুশি হয়েছে।

আমি জানি বাঙুল্যানডের অনেক নারীবাদী এটা শুনে হাহা করে উঠবে এবং এই নারীকেও “অপ্রেসড” “ভিকটিম” বলে চালিয়ে দেবে…ঘর মানেই যখন জেলখানা তখন সেখানকার বিরানীও তাদের কাছে বিষতুল্য… কিন্তু আমি যা দেখি এই উদাহরণে তা হলো একমুখী কাজের ব্যবস্থা এবং স্বীকৃতি। আমি যদি আমার বাচ্চা হোয়া এবং বাচ্চা পালনের সময়ে এই সুবিধা পেতাম আমি লুফে নিতাম। কেউ যদি এসে আমাকে বলত, আপনি পাঁচ ঘন্টা কাজ করে আট ঘন্টার বেতন পাবেন আমি ধেই ধেই করে নাচতাম পারলে আমার মেয়েদের নিয়ে…

ঠিক একারণেই আমীরে জামায়াতের নারীদের নিয়ে বক্তব্য শুনে সত্যিই চোখে পানি চলে এলো। পুরুষ জাতি যারা এটা নিয়ে হাসাহাসি করছেন, ফেসবুক উড়ায়ে ফেলছেন, তাদের আমার করুণা হয় তাদের শিক্ষা দীক্ষা নিয়ে আরো করুণা হয়… অবশ্য নারীদের দুই নৌকায় পা দিয়ে ভাগ হতে দেখে, বাচ্চা চাকরি সব নিয়ে নাকের পানি চোখের পানি এক হতে দেখে, অভিভূত হয়ে তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়ে দু এক কলম লেখা কিংবা রাস্তায় নামাও একটি পলিটিক্স। এই পলিটিক্স আজ পর্যন্ত দেশে কোন সমস্যা সমাধান করতে পেরেছে একটা দুইটা উদাহরণ দিতে পারেন?

আমীরে জামায়াতের বক্তব্য শুনে বিশেষ করে মায়ের কষ্টের যে গভীর সাহিত্যিক বর্ণনা তা শুনে আমার চোখে পানি চলে এলো কারণ আমি আমাকে সেখানে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার বিশ্বাস যত নারী মা হয়েছে সবাই তাদের নিজেদের দেখতে পাবেন সেই বর্ণনার ছবিতে।

যারা আমায় চেনেন, জানেন, আমি যখন মা হয়েছি তখন আমি স্টুডেন্ট এবং তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমি পড়াশোনায় বরাবরই ভালো ছিলাম এবং পড়ুয়া ছিলাম বলে আমি কখনো ই সংসারের জন্য ক্যারিয়ার কম্প্রোমাইজ করতে রাজি ছিলাম না। আমার মত মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছিলো a dream come true । কিন্তু ঠিক এই সময়ে আমার একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য সংখ্যা দশজন। ঠিক কিভাবে নিজের পড়াশোনা চাকরি এবং সংসার চালিয়ে নেবো এটা ছিলো আমার জন্য যুদ্ধ। প্রতিদিন কি রান্না করবো কি খাবো কি খাবে সবাই এই চিন্তা করতে করতে মাঝে মাঝে মনে হতো পাগল হয়ে যাবো। সবাই সহযোগিতা করার পরো মাঝে মাঝে মনে হতো এইখানে হাল ছেড়ে দিই। আর না!

কিন্তু “আচ্ছা আরেকটু চেষ্টা করে দেখি” করতে করতে চতুর্মাত্রিক কাজ করতে করতে কখন যে শরীরের ভেতর নানা অসুখের বীজ বপন হয়ে গেল বুঝতে ই পারিনি। অসুখ তো হবেই ঠিকমতো মায়ের যত্ন না হলে মা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া আর বিশ্রাম না নিলে অসুস্থতা অনিবার্য। আপনারা যারা আজকের লেখা পড়ছেন তারা হয়তো ভাবছেন, আল্লাহ, আপুর হাজবেন্ড কতো সহমর্মী এবং সহযোগী! তাদের বলছি, বাংলাদেশের পারিবারিক এবং সামাজিক সেটাপে একজন পুরুষ যতৈ পরিবারমুখী হন তার বাউন্ডারি ডিফাইনড। তাকে সেই বাউন্ডারি মানতে হয়। তাছাড়া তার নিজের জীবন আছে কাজ আছে। স্ত্রীরা নিজের প্রতি যত্নশীল না হতে পেরে বাচ্চাদের লালন পালনে শরীরের ক্ষয় হবার যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তাতে তারো বেশি কিছু করার থাকে না শুধু প্রতিদিন ঘ্যান ঘ্যান করে বলা, “প্লীজ একটু বেশি বেশি খাও।” “নিজের যত্ন নাও।”

আমার আয়েশ করে খাবার সময় কোথায় ছিল? সকাল সাড়ে সাতটায় বেরুতে হলে কখন ঠিক নাস্তা করতে হয়? আর আয়েশী নাস্তা করতে হলে ঠিক কিভাবে কাজের রুটিন সেট করতে হয়: ১. ফজর নামায, অল্পকিছু ইবাদত: ২. দিনের রান্না আয়োজন ৩. সকালের খাবারের আয়োজন; ৪. বাচ্চাদের কাজ (দুধ খাওয়ানো, বিছানা বদলানো, তাদের পরিস্কার করা, আরো কত কি!)–পাঁচটা থেকে সাড়ে সাত কি এত সবের জন্য যথেষ্ট? তো ইমপ্যাক্ট গিয়ে পড়তো খাওয়ার উপর। কোনরকম কিছু মুখে দিয়ে দৌড়ানো। এই করে করে যখন অনেক অনেক অসুস্থ হয়ে পড়লাম আমার এক খুব চমৎকার ভাবী, একদিন দুঃখ করে বলেছিলেন, “ভাবী কাজ করতে করতে শরীর একদম জ্বালিয়ে ফেলেছেন।” আমার চোখে পানি চলে এসেছিল, আমার পড়াশোনা ক্যারিয়ারের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে কি জীবন অন্যরকম হতো?

অষ্ট্রেলিয়ার কাজে সিস্টেম এবং আমীরে জামায়াতের বক্তব্য আমার এই প্রশ্নের উত্তর। না ক্যারিয়ার ছেড়ে দেয়া কিংবা সংসার কোন সমাধান নয়। সমাধান হলো ইকুইটি (equity)। সমাধান হলো রাষ্ট্রের নাগরিকদের যার যার অবস্থান অনুযায়ী উপার্জনের সুযোগ এবং সুবিধা। কেয়ারিং রেসপনসিবিলিটি একটি বড় রেসপনসিবিলিটি। উন্নত দেশগুলোতে এর পুরোপুরি স্বীকৃতি আছে। যেমন সেদিন জানলাম হাজব্যান্ডের হঠাৎ মৃত্যুতে আমার এক কলিগ ছুটিতে চলে গেছেন এবং তিনি ভালো বোধ না করা পর্যন্ত কাজে আসবেন না। নিশ্চয়ই এমন ছুটির ব্যবস্থা আছে যিনি এই সময়ে এটা ব্যবহার করতে পারবেন।

তাহলে মায়েদের পাঁচ ঘন্টা কর্মদিবসের সমস্যা কোথায়? কম কাজ করে বেশি বেতন পাবেন এর সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো মনে। বাঙালি মুসলমান সমাজ এমন মনস্তাত্ত্বিক কনসটিপশনে ভুগছে যে যেখানে সারাদিন কাজ করার পরো, জামাই বলে, ” সারাদিন তো বাসায় থাকো, সারাদিন কি করো?” “চাকরিতো আমি ও করি, তোমার খারাপ লাগছে কেন?” “তুমিতো একা না, দেখো বহু নারী আজকাল ঘর বাহির সামলায়, তোমার সমস্যা কেন?” সেখানে নারীরা কম কাজ করে বেশি বেতন পাবেন সমাজের ঐ শ্রেণীর এবং একশ্রেণীর জন্য এটা ঠিক আরামের না। কোনদিন যেন আবার পুরুষদের এক অংশ বলে বসে, আসুন আমরা সবাই নারী হয়ে যাই। এটাই ভয়।

এই ভয় অমূলক নয়…আইআইইউসিতে চাকরি করার সময়ে, আমার সম্মানিত পুরুষ কলিগদের মাঝে মাঝে চিৎকার চেঁচামেচি করতে দেখতাম। তারা চিৎকার করে বলতো, ডিপার্টমেন্ট মেয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেবে না। এদের নিলেই সমস্যা। আজকে বিয়ে কালকে প্রেগন্যান্ট পরশু বাচ্ছা অসুস্থ… ডিপার্টমেন্ট কেমনে চলবে? এরা আছে আরামে… এদের ছুটি আর ছুটি। আবার এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন, উনার কাছে ছুটির দরখাস্ত নিয়ে গেলে, দুচার কথা শুনিয়ে দিতেন। আবার রসিয়ে রসিয়ে পাঠান মেয়েদের গল্প বলতেন, এরা নাকি প্রসব বেদনা উঠলে ঝুড়ি নিয়ে বনে চলে যেত আর নিজে নিজে বাচ্ছা হোয়ায়ে বাচ্চা নিয়ে ঘরে চলে আসতো। আবার গর্ব করে বলতেন, তার এতগুলো সন্তান, তার ওয়াইফ তো তার কাছে কখনোই ছুটি চায়নি? তাইলে আমাদের কেন লিভ লাগে?

আমীরে জামায়াত আপনি খুব সুন্দর সহজ এবং কার্যকর রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা বলেছেন। আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু আপনি কি খসড়া কমিটি গঠন এবং নারীবিষয়ক চিন্তা এবং গবেষণার কোন সেল গঠন করেছেন? যারা আপনাকে বাংলাদেশের আপামর নারীদের একটি চিত্র দেবে এবং সেই অনুযায়ী আপনি একটি রিয়েলিসটিক এবং এপ্লিকেবল নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারবেন?

তবে একজন ক্ষুদ্র নারী হয়েও আপনাকে বলবো, প্লীজ শুরুটা জামায়াতের ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে হোক, যেখানে নারীদের চাপিয়ে রাখাই সিস্টেমের নর্ম। সেই সিষ্টেম ভেঙে দিন এবং সেগুলোকে মডেল করে দেশবাসীকে দেখিয়ে দিন, এটা হবে ভবিষ্যতের নারীবান্ধব বাংলাদেশ।

উম্মে সালমা, টুঅং, ১৩/১১/২০২৫

Reflections

স্রী কি সেবাদাসী? সেবাদাস আসলে কি?

একটি বিশেষ দল যখন নারী বিষয়ে সক্রিয় হয়ে উঠে এবং ছলে বলে কলে কৌশলে তাদের একসপায়ারড নারী বিষয়ে জগাখিচুড়ী মার্কা বয়ান হাজির করে নারী পুরুষের কম্প্রোমাইজিং দাম্পত্য সম্পর্ককে নাবোধক ভাবে প্রচার করে আমি বেশ মজা পাই। কারণ পষ্টভাবে দেখি অদৃশ্যমান ঢাবির পদপ্রার্থী নারীকে যখন পোশাক দিয়ে ডিমোনাইজ করা হয় এবং তাসনিম যারা কে সহ দৃশ্যমান নারীকে যখন তার প্রাইভেট পার্টস তুলে গালিগালাজ করা হয় তাদের মুখে টু শব্দটি শোনা যায় না।

তবে বাংলাদেশের দৃশ্যমান (visible) এবং অদৃশ্যমান (invisible) নারীদের রাজনৈতিক এবং সামাজিক অঙনে যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে এবং হচ্ছে তা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট তাহলো নিজেদের পাওয়ার, দক্ষতা এবং এজেন্সি নিয়ে নারীরা যখন এগিয়ে আসে তখন প্রতিপক্ষের কাছে তারা হয় হোর (whore) না হয় উইচ (witch)!

আপনাকে যখন দেখা যাবে, আপাদমস্তক চোখ দিয়ে মাপা যাবে, তখন আপনি তাদের পছন্দের এদিক ওদিক হলেই হবেন হোর। আর না দেখা গেলে, ঢাকা থাকলে, পরিস্কার বোঝা না গেলে গড়নগাড়ন কেমন, তাহলে আপনি দানব। সাথে সাথে মা রিলেটেড সমস্ত গালিতে ওরা সয়লাব করে দেবে পৃথিবী…

এ এক অদ্ভুত সমাজ সংস্কৃতি…এই সংস্কৃতি রাত দিন মায়ের মহিমা প্রচার করে। গান গল্প নাটক উপন্যাস কবিতা সিনেমা সব জায়গায় মা একটি glorified icon, আবার সেই মা জাতকে যখন marginalised and vilify করার দরকার হয় মা আর তার প্রাইভেট পার্টস গালির খিস্তি খেউরের মূল ইমেজ আমেজ হয়ে যায়!

সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে তথাকথিত নারীবিষয়ক চিন্তাবিদরা মুসলিম নারী পুরুষের পারিবারিক সম্পর্কের ধরণ নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে বেমালুম ভুলে যান যে তাদের পরিমন্ডলে নারীও সেবাদাসী। তার সেক্স এবং বায়োলজি তাদের কাছে দিনের আলোর মতো এতোই পরিস্কার যে তাদের সহযোগী নারীর গায়ে হাত দেয়া, তাদের যৌন আহ্বান এবং তাদের যথেচ্ছ ভোগ করা তাদের রক্ষণশীলতা থেকে নারীকে বের করার একটা জঘন্য ফিলোসফি। আর সেই দর্শন দিন শেষে যেই লাউ সেই কদু… নারীকে সেই একই… সেবাদাসীতেই পরিণত করে।

শুধু পার্থক্য হচ্ছে ঘরে যদি একজনের সেবাদাসী হয় বাইরে হয় বহুজনের…এই নির্মম বাস্তবতা যারা চোখ বুজে অস্বীকার করে বিয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠা নারীর স্ত্রীর অবস্থান নিয়ে হাউকাউ করে তাদের জন্য একমুঠো করুণা।

আসলে “সেবাদাস” (সেবা+ দাস) শব্দটি খুব মজার। বেশ Productive। একটু লেনস ঘুরিয়ে দিন, আপনি দেখবেন জগৎ সংসারের নারী এবং পুরুষ যারা নানা social action এ থাকে তারা কোন না কোন ভাবে সেবাদাস এবং সেবাদাসী। আজকাল modern slavery এর কথা শোনা যায়… সেই হিসেবে দেখলে আমরা সবাই কোনো না কোনো ভাবে সেবা দেয়ার দায় নিয়ে ভৃত্যের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছি।

অফিস সবচেয়ে বড় কর্মকর্তা কি কোন না কোন সেবা দিচ্ছেন না? অফিসের ঝাড়ুদার সেও কি কোন না কোন সেবা দিচ্ছেন না? তারা চাইলে কি এককথায় সব বন্ধ করে দিয়ে “আমি স্বাধীন” ঘোষণা দিয়ে সবকিছু থেকে বের হয়ে যেতে পারবেন?

যে নারী পুরুষ ধর্ম সমাজ সংস্কৃতি কে তোয়াক্কা না করে একে অন্যের সাথে আবেগের কোন অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয় তারা কি একে অপরের কোন না কোন সেবা দিয়ে যাচ্ছে না? তাদের কোন একজন কি হঠাৎ করে কোন রকম কথা বার্তা ছাড়া হুট করে সব ছেড়ে ছুড়ে চলে যেতে পারে এই বলে যে, আমি মুক্ত?

যদি সব হিসাব এতো সহজ হতো উন্নত দেশগুলোতে সহ সবখানে কেন এত কাউন্সিলরের চাহিদা? কেন মানুষ এখনো কাঁদে? কেন ভেঙে পড়ে? কেন মানুষ কাউকে পাশে চায়? কেন মানুষ চায় তাকে কেউ বুঝুক আর তার কথা শুনুক? এটা কি এক ধরনের সেবা নয়?

আসলে সেবা করা, সেবা করার মানসিকতা, সেবা করার সুযোগ এগুলো মহৎ মানব গুণ। এর কোন জেন্ডার বা সেক্স নেই। একে বলে ethics of care। বাংলাদেশের এবং বিশ্বের শত শত নারী প্রিয় পরিবার, প্রিয় পুরুষ, প্রিয় সন্তানের জন্য শর্তহীন প্রশ্নহীন এই সেবা অকাতরে দিয়ে যাচ্ছে।

দুকলম পড়ালেখা করে স্পেসিফিক সমস্যা চিহ্নিত না করে প্রগতির নামে সুশীলতার নামে স্বাধীনতার নামে যারা একে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে একে উপহাস করে তারা অবশ্যই একদিন সমাজ সংস্কৃতি থেকে ছিটকে পড়বেই।

উম্মে সালমা, ১/১০/২০২৫, টুঅং।

Reflections

ভালোবাসার সংসারের সম্পর্ক: আত্মসম্মানবোধ নাকি আত্মসমর্পণ?


আমরা যারা ৯০ এর বাংলাদেশের আবহে বড় হয়েছি রবীন্দ্রনাথ নজরুল বিভূতিভূষন কিংবা হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ে, আমাদের অনেকের কাছে ভালোবাসাটা আত্মিক উপলব্ধির, গোপন, নীরব, গভীর। এটা এমন এক অনূভুতির যাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, স্বার্থপরের মতো দাবী করে করে জানান দিতে হয়না, বরং দ্বায়িত্ব, স্থায়িত্ব, এবং ত্যাগের বিনিময়ে ফুটিয়ে তুলতে হয়।


নজরুলের “ব্যাথার দান” যখন পড়তাম, কি গভীরভাবে আমাদের ভাবিয়ে তুলতো: না পাওয়া ভালোবাসার কষ্টের কথায়। কিংবা হিমু যখন আসবে বলে ও আসতো না, আমরা বুঝতাম, হিমু রুপা কে কি গভীর ভালোবাসে এবং ভাইসভারসা কিন্তু তারা একে অন্যের কাছে আসতে পারে না। কিন্তু তাই বলে ভালোবাসা মিথ্যা হয়ে যায় না। বরং কি এক গভীর অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত ভালোবাসা সম্পর্কগুলো কত সুন্দর! শত না পাওয়ার মাঝে কত টান!


মাঝে মাঝে ভাবি এইসব অতিপ্রাকৃত আয়োজনের মাঝে বেড়ে ওঠাই আমার জন্য কাল হয়েছে। আমার জীবনে বিয়ে সংসারের মাধ্যমে যে নারী পুরুষের স্বাভাবিক আকর্ষনের যাত্রা শুরু হয় তার মধ্যে এইসব কিছুটা ফিলোসফিক্যাল কিছুটা কাব্যময় কিছুটা আত্মিক কিছুটা শব্দহীন ভালোবাসা ঢুকে পড়ে গেছে।


আমি গভীর ভালোবাসতে পারি যে কাউকে কিন্তু যে নদী গভীর বেশি তার বয়ে চলার শব্দ তত কমের মতোই আমার ভালোবাসার প্রকাশ। অতি প্রদর্শনী অতি মুখরতা অতি তরতরানো দেখলে বিরক্ত লাগে এবং লাগতো। এগুলোকে বরাবরই ফেইক মনে হতো। মনে হতো, আরে, যেখানে ভালোবাসা মমতা মায়া আছে সেখানে সম্পর্ক যে কোনো মূল্যে সুন্দর হবেই। আমার সততা আমার বিশ্বস্ততা আমার অনুরাগ আমার আবেগ আমার ভালোবাসার মানুষ এবং মানুষেরা বুঝবেই! আর এইজন্য নিজের ভেতর একটা আত্মসম্মানবোধ সবসময়ই জেগে ছিল।
আমি ভাবতাম, ভালোবাসা শ্রদ্ধেয় এবং শ্রদ্ধার। এখানে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকবে এবং তা থাকবে আত্মসম্মানবোধ থেকেই। মর্যাদাবোধ থেকে।

এবং ব্যাপারটা এমনো মনে হতো যে, যে আমার এই দর্শন এই গভীরতা বুঝতে পারবে না, তার আর কি যোগ্যতা ই বা আছে আমার জীবনের অংশ হবার? সে যদি বুঝতে না পারে, তাকে আমি চাই এবং তার প্রতি আমি বিশ্বস্ত, তাহলে সে আর কি বুঝে ? হতে পারে ভাষার প্রকাশ কম, হতে পারে শব্দের কোলাহল নেই: ঠিক নজরুল যেমন বলেছিলো:

যারে চাই তারে কেবলি এড়াই কেবলি দি তারে ফাঁকি
সে যদি তুলিয়া আঁখি পানে চায় ফিরাইয়া
লই আঁখি

কিন্তু ভালোবাসার এই আত্মসম্মানবোধ নিয়ে আজকাল নতুন করে ভাবতে থাকি। হুড়মুড় করে সোশাল মিডিয়ার আগমন এবং মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের সহজ সুযোগ দেখে মাঝে মাঝে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাই। আপনি স্যোশাল মিডিয়ায় নীরব, ভাবছেন বেঁচে গেলেন? না একদম না। আপনি আপনার ব্যাক্তিগত জীবন ফেসবুকে হাইলাইট করেন না, আপনি বেঁচে যাবেন? একদমই না।

বাস্তব জীবনে এমন কিছু মানুষ এবং ঘটনার সম্মুখীন হতে পারেন, সেখানে আপনি “অসুখী” ” অযোগ্য” ” ব্যর্থ” হিসেবে বিবেচিত হবেন। আপনার গোপন নীরব গভীর ভালোবাসার ফিলোসফি কে তুড়ি মেরে আপনার সঙী আত্মীয় পরিজন কে বাগিয়ে নেয়ার জন্য অথবা আপনার জীবনে বাগড়া দেয়ার জন্য একদল একদম প্রস্তুত।

ভালোবাসা যেখানে আপনার কাছে আত্মসম্মানবোধ তাদের কাছে ভালোবাসা ভালোলাগা মিথ্যা আত্মসমর্পণ। দু’ একদিনের পরিচয়েই গায়ে পড়া, ইনিয়ে বিনিয়ে মিষ্টি মধুর করে কথা, মিষ্টি নামে ডাকা, ঘন ঘন ফোন করা, মেসেজ পাঠানো, গোপন ব্যক্তিগত সুখ দুঃখের কথা শেয়ার করা…আর এসবের ফাঁকে ফাঁকে আপনি দেখতে পাবেন এরা কেমন করে আপনার জীবনসঙ্গী/পার্টনার/ ভালোবাসার মানুষের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। তখনি আপনি দেখবেন আপনার চেনা মুখ নতুন রঙ নিচ্ছে এবং ভাবছে, “আরে, ওতো কখনো আমার কাছে এত আত্মসমর্পণ করেনি, এমন করে আমার হাতের মুঠোয় আসেনি? এমন করে আমাকে প্রশংসা করেনি? এতো আমার সবকিছু নতুন করে পাওয়া।” তখন সে কিন্তু নিমিষেই ভুলে যেতে পারে আপনার দার্শনিক ভালোবাসা কে।

জানি এসব সব ঠুনকো, লোক দেখানো, শয়তানের ওয়াসওয়াসা এবং শেষ মেষ জঘন্য অপরাধ, তবুও এসব দেখে দেখে নতুন করে ভাবতে থাকি, ভালোবাসা সম্পর্ক মমতা মায়া এসব আসলে কি? এসব কি আত্মসম্মানবোধে মোড়ানো একটি সুন্দরের নাম না লজ্জা শরম বিহীন লোক দেখানো আত্মসমর্পণ? কোনটা আসলে ভালো? ভাষাহীন ভালোবাসা না মোহময় শব্দের বেসাতি? নাকি ভালোবাসার কোন অস্তিত্ব নেই, সব শরীরের খেলা: হরমোনের প্রভাব। মন বলে কিছু নেই। নারীর পুরুষ হলেই হয়, পুরুষের নারী। ব্যাক্তি এখানে তুচ্ছ!

জানি না, জানতে চাই না তবে কেন যেন মনে হয়, যত যাই হোক, দুনিয়ার যত পরিবর্তন আসুক, ভালোবাসার মায়ার মমতার শক্তি আর সততা সাময়িক ভূপাতিত হলেও তার মৃত্যু নেই ক্ষয় নেই পরাজয় নেই। সত্য তো চকচকে হয় না, সত্য হয় দৃঢ় ক্ষয় লয় বিহীন।সৎ মানুষের জীবনের সফলতা ওখানেই।

উম্মে সালমা, ২৫/০৬/২০২৫

Reflections

সারাজীবনের মধ্যবিত্তের গল্প


পরিচিত শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু বান্ধবরা যখন সেমিষ্টারের শুরু মাঝখান এবং শেষে ছুটি পেলেই দেশের দিকে ছুটে যায়, আমি বসে বসে ভাবি, আহারে কি আনন্দ আকাশে বাতাসে! সেই সাথে নিজেকে জিজ্ঞেস করি, ইস, আমি পারিনা কেন? বেশ হতো যদি এরকম হুটহাট দেশ থেকে বেড়িয়ে আসা যেতো!

আসলেই বেশ হতো! কিন্তু সাধ আর সাধ্যের মধ্যে যে অনৈক্য তা কি আর বলতে! এই সাধ্য দায়িত্বের এবং অর্থনৈতিক। একসময় বাচ্চারা ছোট ছিল। পড়ালেখার চাপ বা প্রয়োজন অতটা ছিল না। যখন তখন হুটহাট করে ওদেরকে প্যাক করে বেরিয়ে পড়া। প্রথম প্রথম অষ্ট্রেলিয়া এসে এত ঘুরেছি আলহামদুলিল্লাহ।

অথচ এখন একপা দেয়ার আগে ওদের সাথে কথা বলতে হয়। চোখ রাখতে হয় ওদের কখন এসেসম্যান্ট কখন স্কুলে কি ব্যস্ততা!আর স্কুলের বাইরে যেহেতু এখানে বাচচাদের ফ্রেন্ডগ্রুপ নেই বললেই চলে, ওদের সব আনন্দ নিরানন্দ পড়াশোনা খেলাধুলা সব কিছু স্কুল কেন্দ্রিক। আর এখানে সিস্টেমটা এমন একটি টার্ম শুরু হলেই একটার পর একটা এসেসম্যান্ট এবং এক্সাম চলতে থাকে… ওদের এদিক ওদিক মাথা দেয়ার সময় ই হয়না! তাই ইচ্ছে করলেই বেরিয়ে পড়তে পারিনা।
তার মাঝে খরচের হিসাবো করতে হয়। দেশে যাওয়া হুট করে? মোটা অংকের টিকিটের দাম। আপনি সারা বছর অল্প অল্প করে মেপে মেপে চলে কিছু সঞ্চয় করেছেন, একবার দেশে যাওয়া মানে ঘ্যাচ! ঘ্যাচ ঘ্যাচ! দেশে গেলে হিসেবের কোন আগামাথা খুঁজে পাইনা। কোথা থেকে এত খরচ আসে জলের মতো ডলার টাকা হয়ে বেরিয়ে যায়…২০২২ এ মনে পড়ে দেশে গিয়ে আমার জমানো ডলার পাউন্ড সব খরচ করে ইসলামী ব্যাংকের জমানো টাকা খরচ করে শেষে লোন পর্যন্ত করতে হয়েছে…

প্রবাসী (নিম্ন?) মধ্যবিত্তের জীবন আসলেই বেশ ঝক্কির। শুধু হিসাব নিকাশ শুধু প্লানিং শুধু ম্যানেজমেন্ট…

এসব দেখে দেখে মাঝে মাঝে দেশের জীবন নিয়ে ভাবি। আচ্ছা, দেশে থাকতে কি জীবন অন্যরকম ছিল? দেশের উচ্চশ্রেণীর চাকরি (বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা) করা মধ্যবিত্তের মতোই কি ছিলাম না? ভালো বেতন ভালো বাসা ভালো খোরপোষ সামাজিক অবস্থান সবকিছু ছিল কিন্তু কোন দিক দিয়ে টাকা আসতো আর কোনদিক দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ আত্মীয় পরিজন নিয়ে বাস করতে গিয়ে চলে যেতো মনে হয় হাতড়ে বেড়াতাম। সাঁতরে বেড়াতাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুবাদে কখনো কখনো আমাদের হাজবেন্ড ওয়াইফের মন উড়ু উড়ু করতো–ইস, যদি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে পারতাম। একটি পিএইচডি! না হয় একটি মাস্টার্স! উন্নত দেশে। একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

যখন দেখলাম, আরিব্বাস, এ আরেক কঠিন সংগ্রামের নাম, আমার মনে আছে, আমি ভাবতাম, থাক, ও পথে না গিয়ে, ঘরের কাছে মালয়েশিয়ায় একটি মাস্টার্স করি। হিসেব করে দেখলাম, তাও বেশ কিছু টাকা যে টাকা আমাদের কাছে নেই! এখনো মনে আছে একদিন এ নিয়ে আমাদের মধ্যে কি কথা কাটাকাটি রাগারাগী! আমি তাকে বলছি, টাকা জোগাড় করতে! সে বলছে, কোত্থেকে? সে পারবে না। ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন
মনে হলো, এই এক জিনিস…এই টাকার জন্য জীবনে অনেক ভালো ভালো স্বপ্ন বোধহয় অধরা রয়ে যাবে!

এইসব কিছু নিয়ে যখন একসাথে করে জীবন নিয়ে ভাবি, তখন বুঝতে পারি আল্লাহ এভাবেই বিশ্বাসীদের জীবন টানাপোড়েন কষ্ট ক্লেশ পাওয়া না পাওয়া দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। কোন কিছু চাইতে গেলে যে এই যে হাজারো হিসেবে নিকাশ হাজারো বাঁধা হাজারো প্লানিং এবং ম্যানেজমেন্ট এটাই আল্লাহর তরফ থেকে তার বান্দার প্রতি রহমত দয়া আর জীবনের পরিকল্পনা। আল্লাহ চান এই ঝক্কির মাঝে যেন আমি আমরা তাকে ইকুয়েশনে নিয়ে আসি: তার কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি দোয়া করি তার কাছে সামর্থ্য চাই তার কাছে শক্তি চাই। জীবনে কিছু পাই বা না পাই জীবনের ইকুয়েশনে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে ইনক্লুড করতে পারাটাই সফলতা।

কতটুকু তাকে জীবনে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছি জানিনা, তবে শত শত শত সমস্যার মাঝে আমি নিজেকে ধনী বলেই মনে করি। হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যার একদিনের খাবার আছে একটা সুস্থ শরীর আছে মাথা গোঁজার মতো ঠাঁই আছে যে একদিন সকালে কোনরকম যন্ত্রণা ছাড়া ঘুম থেকে সহজ স্বাভাবিক ভাবেই জেগে ওঠে দিনের কাজ শুরু করলো, সেই পৃথিবীর রাজা। তার জীবন রাজার মতো।

প্রতিদিন সকালে নিজেকে মনে করিয়ে দেই এই কথাটা। প্রতিদিন নিজেকে বোঝাই চেয়ে পেয়ে যাওয়ার জন্য জীবন না! জীবন পরীক্ষার কষ্টের যন্ত্রণার। নিজেকে বোঝাই, আফসোস করো না। তাকে পরিবর্তন করো শুকরিয়ায়। আলহামদুলিল্লাহ’য়। তাইলে শত শত শত অপূর্ণতার মাঝে তুমি বেঁচে থাকবে শান্তি আর স্বস্তিতে।

উম্মে সালমা, ২৭/০৬/২০২৫, টুঅং

Cultures, Reflections

বৈশাখী ভাবনা

ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কবি পারসিবিসি শেলীর “Ode to the West Wind” কবিতাটা কম বেশি সবারই পড়া এবং জানা। কবি তার এই কবিতায় কিভাবে ইংল্যান্ডের পশ্চিমা বাতাস পুরোনো প্রকৃতির সবকিছু পরিবর্তন করে নতুনদের সূচনা করে, সেটা দেখিয়েছেন আর সেই বাতাসকে যে বসন্তের বোন তাকে বলেছেন তাকেও জাগতিক সমস্ত দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করতে।

পশ্চিম বাতাসের ছোঁয়ায় তিনি যেন ভুলে যান অতীতের সব কষ্ট আর নতুন উদ্যমে জীবনকে চেনেন এই ভেবে যে, শীত আসলে বসন্ত কত ই বা দূর (If Winter Comes Can Spring be far behind?)। তিনি এই প্রাকৃতিক উপাদানকে বলেন তার বৈশিষ্ট্য তাকে দিতে যেন তার লেখা দিয়ে তিনি সারা পৃথিবীতে শান্তির আর সাহসের বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারেন।

কবিতাটির অসম্ভব সুন্দর বৈশিষ্ট্য হলো পশ্চিমা বাতাস কি কি পরিবর্তন আনে কিভাবে পরিবর্তন আনে তার বিশদ বিবরণ। তার একটি হলো এই বাতাস যখন ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বইতে শুরু করে গাছের সব পুরোনো পাতা ঝরতে শুরু করে। কবি বলেছেন, পাতাগুলো এখন রুগ্ন। তারা হয়ে পড়েছে হলুদ, কালো, মরচে লাল, ধূসর । পশ্চিমের বাতাস তাদের উড়িয়ে বেড়ায় আর তার সাথে ফল ফুলের বীজগুলোকেও, পাতা পচে মরে যায় কিন্তু বীজগুলো ঘুমিয়ে পড়ে মাটিতে যতক্ষণ না বসন্ত আসে, তাদের কাঁপিয়ে জাগিয়ে দেয়া বসন্ত…

পুরো বর্ণনা আমাদের সামনে তুলে ধরে ঋতু পরিবর্তনের খেলা: এক ঋতু চলে গেলে আরেক ঋতু আসে, হেমন্তের পর শীত তারপর বসন্ত … প্রকৃতি ধূসর মৃত হতে জেগে উঠে নতুন রুপে নতুন ফল ফসল নিয়ে।

বৈশাখ এলেই এই কবিতা আমার মনে পড়ে যায়। আমি ভাবতে থাকি বাংলাদেশের ঋতু পরিবর্তনের খেলায় বসন্তের বৈশাখে কি কি পরিবর্তন আসে! আমের মুকুল বড় হতে থাকে, কাঁঠালের গায়ে কাঁটা বড় হতে থাকে…এদিকে ফসল তোলা হয়ে গেছে। কৃষকের মনে আনন্দ। খাজনা আদায়ের পরো গোলা ভরে যাবে ধানে । সামনের কয়েকটা মাস আর চিন্তা নেই। তখনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়নি তখনো নিষ্ঠুর জমিদারের হাতে বন্দী হয়নি আয়ের এবং আনন্দের উৎস “ফসল”।

তাইতো বাঙালি মুসলমানের ঘরে ঘরে আনন্দের বন্যা বয়ে যেতো। কৃষকেরা কৃষাণির মায়ার হাতে তৈরি করা পান্তা ইলিশ ভর্তা দিয়ে এবং পিঠা পুলি খেয়ে খাজনা দিতে যেত আর মেতে উঠতো নানারকম মেলায় খেলায়: নৌকা বাইচ, দাড়িয়াবান্ধা, কুস্তি প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। এই উপলক্ষে বসতো মেলা: ঘরের যাবতীয় সব তৈজসপত্র আর বাহারী কসমেটিকস আর সাজসজ্জার উপকরণে। আসতো নাগরদোলা আরো কত কি!

এসব উদযাপনে তো এই মাসকে পূজা, প্রকৃতি পূজা, ধারণার পূজা, বিরোধী পক্ষকে অপরায়ণ এসব ছিলোনা। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে শীত গিয়ে বসন্ত গিয়ে নতুন ফল ফসলের গোলা ভরার যে বার্তা আজকের ব্যবসা বাণিজ্য চাকরিতে ব্যাংক ব্যালেন্সের মতো। খাজনা প্রদান আজকের ট্যাক্স দেয়ার মতোন। কে না খুশী হয় আয় ব্যয়ের সামঞ্জস্যে এবং দিন শেষে তার সঞ্চয়ে লাভে মুনাফায়? আর এই প্রাপ্তি পরিশ্রমী কৃষক কৃষাণি জীবনের অনিবার্য অনুসঙ্গ ছিল বলেই বৈশাখের দিনগুলো তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ‌

সময়ের বিবর্তনে যারা একে বিশেষ ধর্মের এবং বিশেষ রাজনীতির রুপ দিয়েছে এবং যারা একে ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কারণে প্রত্যাখ্যান করেছে দুটো অংশ ই প্রান্তিক। প্রথম গোষ্ঠী হলো আদর্শের দিক দিয়ে চরমপন্থী, প্রোপাগান্ডামুখী এবং ইসলামোফোবিক। এরা সংস্কৃতির সব উপাদানকে তাদের রাজনৈতিক রঙ দেয় এবং হাতিয়ার বানায়। এই কাজটি করতে গিয়ে সাংস্কৃতিক অথেনটিসিটি কিংবা ডাইভার্সিটি চাপা দিয়ে মারে। বাংলাদেশের সংস্কৃতির মার্জিত উপাদানগুলোকে হাইজ্যাক করে। করেছে।

অন্যদিকে বৈশাখ-পরিত্যক্ত অংশ ধর্ম এবং সংস্কৃতির যোগাযোগ অস্বীকার করে এবং এই দুটোর কথোপকথন কেমনে হয়, কেমনে মানুষের সুকুমার বৃত্তির চর্চা করতে হয়, কেমনে ধর্ম আর জীবন যাপন পারমিউটেশন কম্বিনেশন করতে হয় এরা এসব নিয়ে ভাবতে চায় না। ভাবে না। জীবন ধর্ম মানুষ সমাজ সংস্কৃতি চারপাশ এদের কাছে কিছু রিচুয়্যালে বাঁধা। এর বাইরে সব “নিষেধ”, সব “হারাম।”

হ্যাঁ বৈশাখের আধুনিক শহুরে এলিটশ্রেণীর ক্যাপাটালিষ্ট এবং কনজিউমারিষ্ট কালচারাল দিক সমালোচনার যোগ্য। আচ্ছা বৈশাখ এলেই আপনাকে কেন নতুন শাড়ি পাঞ্জাবি কিনতে হবে? কেন শাদা লাল ই পড়তে হবে? কেন ইলিশ ভর্তা পান্তা খেতে হবে? কেন সব জিনিস চড়া দামে বিক্রি হবে? এই বাজার বাজেট কাদের সৃষ্টি এ নিয়ে আলাপ যৌক্তিক । কিন্তু ঋতু পরিবর্তনের যে এপিল গ্রামীণ জীবনের যে ইতিহাস ঐতিহ্য নষ্টালজিয়া তাতো এসব ফলস ফিলোসফির এবং তার প্র্যাকটিসের জন্য মিথ্যা হয়ে যেতে পারে না!

এই ইতিহাস ঐতিহ্য নষ্টালজিয়ার চর্চাই আমাকে আকৃষ্ট করে। আমি খুঁজি এর থেকে আমাদের আত্মপরিচয়ের কি বার্তা আছে । খাওয়া দাওয়া পোশাক আশাক গাল গল্পের চকচকে অন্তঃসারশূন্য খোলসের আড়ালে “সত্যিকারের বৈশাখ” খুঁজতে থাকি। এমন বৈশাখ যেখানে আমার পূর্ব পুরুষদের গন্ধ। এমন বৈশাখ যেখানে আমার শিকড়ের চাষবাস। এই চাষবাস একদিনের নয়। একদিনের জন্য নয়।

এটা বোঝার জন্য যে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদেরো ইতিহাসের পুনঃপাঠ এবং সেই সাথে পজিটিভ পরিবর্তনের সুযোগ আছে। বৈশাখীর উষ্ণ বাতাসে দানবীয় শক্তিকে উড়িয়ে দেয়ার মতো উপমার দরকার আছে। রক্তাক্ত অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভালোর পথে গঠনের পথে এগিয়ে যাবার শিক্ষা নেয়ার দরকার আছে।

আর কতকাল বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলবে? কতকাল আমরা শুধু একটা বন্যা আর জলোচ্ছ্বাসের দেশ হয়ে থাকবো? আর কতকাল আমাদের সম্পদ লুট হবে?

আমাদের ফল ফসলের দিন আসুক, আমাদের লুট হয়ে যাওয়া গোলাগুলো আবার সম্পদে ভরে যাক। ঘরে বাইরের সব বর্গী নিপাত যাক। বৈশাখ হয়ে উঠুক সত্যিকারের অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সামাজিক যোগাযোগ, এবং শান্তি স্বাধীনতার প্রতীক।

উম্মে সালমা, ১ এপ্রিল ২০২৪.

Reflections

চ্যাটজিপিটি এবং মানবিক বাস্তবতা

CHATGPT কিংবা এরকম কিছু AI নিয়ে একাডেমিক মহলে একটা হৈচৈ চলছে। তবে উন্নত বিশ্বের হৈচৈ এখন অনেকটা বিশ্লেষণ আর পলিসির পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং কিভাবে শিক্ষায় AI অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ হয় এ নিয়ে পরিস্কার দিকনির্দেশনা দেয়া হচ্ছে এবং সেই সাথে এই দিকনির্দেশনা না মানার ফলাফল শিক্ষার্থীদের মানতে এবং বহন করতে হচ্ছে। AI এর উপযুক্ত ব্যবহার নিয়ে ও চলছে নানা প্রশিক্ষণ কর্মশালা যাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এবং গবেষকরা নিজেদের হিউম্যান পটেনশাল সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে পারেন।

AI এর ব্যবহার নিয়ে একটি এনালোজি প্রশ্ন আকারে বার বার আমাদের সামনে আসে। যেমন, আপনি কি এমন বিমানে চড়বেন যে বিমানের পাইলট তার কোর্সে প্রতিটি আসাইনমেনট AI দিয়ে প্রস্তুত করতো? এরকম পাইলট কি আসলেই বিমান চালনার জন্য দরকারি সব স্কিল অর্জন করতে পারে? তার হাতে যাত্রীরা কতটুকু নিরাপদ?

কিংবা আপনি কি এমন ডাক্তারের কাছে যাবেন যে পড়ালেখা না করে সবকিছু AI CHATGPT দিয়ে করিয়ে ডাক্তারী পাশ করে রোগীর চিকিৎসা সেবায় নেমেছে? এই ডাক্তার কি বুঝবেন সঠিকভাবে কি হচ্ছে কেন হচ্ছে? তার নিখুঁত আসাইনমেনট কিংবা উচ্চ নম্বর কি রোগীর উপকার করবে?

ব্যপারটা ভাবনার এবং মজার। আপনি হয়তো বলবেন, ওকে ক্রিটিক্যাল সেক্টরে AI-induced শিক্ষাপদ্ধতি চলবে না। বাকিগুলোর কি সমস্যা? AI কে বললে একটা আর্টিকেল লিখে দেবে, একটি বুক রিভিউ করে দেবে, একটা এচে লিখে দেবে, এবং এভাবে কবিতা গল্প উপন্যাস সব সব…তো!

তো আপনার কাছে একটা প্রশ্ন, আপনি তাইলে কি জন্য আছেন এখানে? আপনার কাজ কি? একটা রোবট কি আপনার রিপ্লেসমেন্ট?

ইমোশনাল প্রশ্ন আপার্ট, আসলে কি AI CHATGPT উপরে উল্লেখিত কাজগুলো আপনার মতো করে করে দেবে? আমার অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান হলো, না করে দেবে না। এই রোবট তা পারে না।
আপনারা যারা এগুলো নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন তারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, CHATGPT এর সমস্যা এবং লিমিটেশনগুলো:

১. সে কোন টপিকসের সুক্ষ, গভীর, এবং চিন্তাশীল বিষয়গুলো ধরতে পারেনা। যেমন, আপনি একটি আর্টিকেলের সামারি দিতে বললেন, সে ভাসা ভাসা কিছু আইডিয়া দিতে পারে কিন্তু মূল যে কম্প্রিহেনসিভ আইডিয়া সেটা দিতে পারে না। এখানেই গবেষকরা থমকে দাঁড়ায় এবং বিরক্ত হয়। এবং কেউ যদি এভাবে কিছু প্রডিউস করে জমা দেয়, আমি ক্লিয়ারলি বুঝতে পারি এটা CHATGPT লিখেছে এবং সেজন্য কোন ডেপথ নেই।

২. সে অনেক সময় খুব ডিসেপ্টিভ। বিশেষ করে সোরস এবং রেফারেন্সের ব্যাপারে। যেমন, ধরেন আপনি একটা লেখার কমান্ড দিয়েছেন, সেটা লিখতে গিয়ে সে পর্যাপ্ত পরিমাণে রেফারেন্স পাচ্ছে না বা অনেক জটিল আইডিয়া ( যেমন Michel Foucault দিয়েছে) পেনিট্রেট করতে পারছে না, তাইলে সে এক সোরসের সাথে আরেকটি লাগিয়ে মিথ্যা একটা রেফারেন্স দিয়ে দেবে। নতুবা নিজের মতো রেফারেন্স বানাবে। এগুলোকে বলা হয়, confected আইটেম। তো এটা এই বস্তুকে unreliable করে ফেলেছে।

৩. ChatGPT র ভাষা খুব লিমিটেড এবং মেকানিকেল। এর কিছু ভোকেব আছে ব্যস! যা-ই লিখবে ওগুলো দিয়ে ই লিখবে। তাই ওর ভাষা খুব মোনোটোনাস। তাই এর ব্যবহার একজন শিক্ষার্থীর একজন লেখকের (যে কোনো বিষয়ে লেখাকে) মনোটোনাস করে তোলে।

৪. আপনি একে দিয়ে কবিতা লিখাতে পারবেন। কিন্তু এতটা ড্রাই আর মমতা হীন পাবেন যে আপনার কবিতা জিনিসটার উপর মন উঠে যাবে। যেমন, আপনি যদি নিজচোখে একটি জায়গা দেখেন আর তারপর তাকে নিয়ে ওকে লিখতে বলেন, আপনি যা দেখেছেন সে কোনদিন সেটা লিখতে পারে না। সে কিছু গাছপালা আর প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা বলে ক্ষান্ত দেবে। যে কোন ক্রিয়েটিভ কাজে সে ইমোশানাল ইন্টেলিজেন্স আনতে পারে না।

৫. আপনি তার কাজে বিরক্ত হয়ে যতবার কমান্ড দেবেন ঘুরে ফিরে সে একি জিনিস নানা ভাবে আপনাকে দেবে। পরে সব মিলিয়ে দেখবেন তার এরিয়া একটি সীমানায় বন্দী।
এসব কিছু ভাববার বিষয়। খুব ভাববার। আমি/আমরা কি শিক্ষায় গবেষণায় সৃষ্টিতে আমাকে/আমাদের দেখতে চাই? না একটি রোবটকে দেখতে চাই? একটি রোবট কি আমার সহযোগী হবে না আমার অল্টারনেটিভ/ আমার ছায়া/ আমার কাউন্টার-সেলফ হবে?

আমার ক্ষেত্রে “আমি” ( sense of self) খুব গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করেছেন যে বৈশিষ্ট্য দিয়ে সেগুলো নিয়েই এই আমি। আমি এই “আমি” কে ইকসপ্লোর করতে চাই।
তাই CHATGPT আমার কাছে অন্যকোন অনলাইন টুলস থেকে বেশি কিছু না। আমি একটি ভ্যাকুয়াম মেশিন যেমনে ব্যবহার করি, একেও এমনে ব্যবহার করতে চাই। এটা যেগুলো পরিস্কার করতে পারে না, আমি অন্যভাবে অন্যকিছু দিয়ে পরিস্কার করি। আমার কাছে মানুষের emotional agency, capabilities, and intelligence নাম্বার ওয়ান। সেগুলো খাটিয়ে বুদ্ধিভিত্তিক এবং সৃষ্টিশীল হবার বিকল্প নেই।

কিন্তু একে কিভাবে ব্যবহার করা যায়? প্রথমে যে বিষয়টি আমাদের মনে রাখতে হবে ChatGPT এবং সমরূপ AI tools নিয়ে সেটা হলো, বিজ্ঞানের এই অভূতপূর্ব অগ্রগতি এবং ওয়াল্ড ওয়াইড প্রযুক্তি পৌঁছে দেয়ার মতো কানেক্টিভিটি আমাদের সময়ের বাস্তবতা। এই বাস্তবতা আমাদের সত্যি খুব চমৎকৃত করে এবং জীবন অনেক সহজ করে । কিন্তু এই বাস্তবতা আমাদের যেন অন্ধ না করে এই সতর্কতা এবং সচেতনতা এই সময়ে খুব জরুরী। তাই AI tools কে আমরা যেমন অন্ধের মত অনুসরণ করতে পারিনা তেমনি তাকে ছুড়ে ফেলেও দিতে পারিনা।

তাহলে তাকে কিভাবে ব্যবহার করতে পারি?

১. লেখার সহযোগী হিসেবে: ধরুন একটা জটিল আইডিয়া আপনার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কিন্তু আপনি একে কাগজে কলমে পিন ডাউন করতে পারছেন না। আপনি আপনার প্রাইমারি আইডিয়াটা তাকে লিখে দিলে সে মোটামুটি একটি সাজানো একটা আইডিয়া দিতে পারে। তখন আপনি সেই আইডিয়াকে আপনার মতো একসপানড করতে পারেন। নতুন নতুন আইডিয়া যোগ করতে পারেন। সংশোধন এবং বিয়োজন করতে পারেন। কোন কিছু লেখার যে অব্যাহত টেনশন সেটা থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে পারেন।

২. এই সব করার সময় আমাদের মনে রাখতে হবে আমি ওর আইডিয়া নিচ্ছি আমার প্রয়োজন অনুযায়ী, কিন্তু আমি ওর ভাষা নিচ্ছি না। তো আপনার লেখার পরবর্তী স্টেপ হলো আপনার লেখার ভাষা আপনার করে তোলা। ChatGPT র রোবোটিক, বোমবাস্টিক, এবং মনোটোনাস ভাষা বাদ দেয়া, সংশোধন করা, পরিমার্জিত, এবং পরিশীলিত করা। চ্যাটজিপিটির কথা আপনার যতৈ সুন্দর লাগুক, আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, আপনার লেখা আপনি যখন একটু সময়ের গ্যাপে পড়বেন আপনি নিজেই মুগ্ধ হবেন, ” আরে, এটা আমি লিখেছি?”

৩. যে কোন তথ্যে nuances and details এড করা। যেমন, আপনি একটি আর্টিকেল রিভিউ করতে দিলেন, ChatGPT আপনাকে জেনারেল একটা ধারণা দিলো কয়েক প্যারায়। আপনি এটা এবং মূল লেখা পাশাপাশি রাখুন এবং মূল লেখা পড়তে থাকুন। এরপর মূল লেখার গভীর আইডিয়াগুলো জেনারেল কথাগুলোর সাথে incorporate করুন। এটুকু কষ্ট তো করতেই হবে না হলে লিখবেন বা শিখবেন কিভাবে?

৪. আরেকটি সুন্দর জিনিস ChatGPT করতে পারে সেটা হলো কমান্ড অনুযায়ী টেবল বানানো। আপনি টেবিল বানিয়ে সেটা আপনার মতো করে আবার সাজিয়ে নিতে পারেন। তবে হ্যাঁ, বিজ্ঞান গবেষণার নানারকম গ্রাফ আঁকতে পাওয়ার পয়েন্ট বা ম্যাটল্যাব ভালো।

৫. টুরিস্ট গাইডেনস ভালো দিতে পারে ChatGPT. যেমন আপনি এমন দেশে ঘুরতে যাবেন যার তথ্য তার কাছে আছে। সে সুন্দর করে একটি ইটিনারি দেবে কোথায় যাবেন কেমনে যাবেন কোথায় থাকবেন ইত্যাদি।‌ কিনতু তারপরও মানুষের সাহায্য নিতে ভুলবেন না!

৬. ট্রান্সলেশন কাজে ব্যবহার করা যায়। তবে সে ভাষাগত (ভাবগত নয়) অনুবাদ করে। ফলে সেক্ষেত্রে আপনার ইনটারভেশন জরুরি। সরাসরি তার ইনপুট ব্যবহার রিস্কি। আমি বাংলায় একটি সরকারি চিঠি সময় বাঁচাতে ওকে অনুবাদ করতে দিয়েছিলাম। সে করতে পারেনি। পরে আবার নিজেকে বসে সরকারী terminology তে দক্ষ ব্যক্তির সহযোগিতা নিয়ে সেটা অনুবাদ করে জমা দিতে হয়েছে।

৭. পৃথিবীর যাবতীয় দেশের যাবতীয় তথ্য তার কাছে নেই। আপনি যদি থার্ড ওয়ার্ল্ড সম্পর্কে লেখালিখি গবেষণা ইত্যাদি করেন, সে আপনাকে খুব কম সহযোগিতা করতে পারবে। আমি বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়া বিষয়ক বিশেষ কিছু বিষয়ে (যেমন মোঘল আমলের জীবন) অনেক কিছু কমান্ড দেয়ার পর সেখানে ভালো কিছু পাইনি। পরে বুঝলাম ওগুলো ওকে ইনপুট দেয়া হয়নি। আসলে এখন পর্যন্ত টেকনোলজিক্যালি ডেবেলভপট পৃথিবী এবং তার জ্ঞানভান্ডার AI এর মূল মস্তিষ্ক। ওকে এই সংক্রান্ত কাজে ইনফরমেশন এর জন্য ব্যবহার করা যায়।

সবচেয়ে বড় কথা হলো ChatGPT শিক্ষা গবেষণায় সৃষ্টিতে একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে কিন্তু মূল ভূমিকা নয়। সে আমাদের জীবন সহজ করতে পারে কিন্তু মূল কাজ আমাদের করতে হবে। কারণ আমাদের যুগ হলো তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং প্রাপ্তির যুগ। তথ্য জ্ঞান নয়: knowledge and information are far different from each other। জ্ঞান তথ্যের স্তুপ থেকে বিচার বিবেচনা আলাপ আলোচনা বিশ্লেষণ পরিমার্জনায় অর্জন করতে হয়। মানুষ তাই ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স এবং এজেন্ট।‌

উম্মে সালমা, ১২/০১/২০২৪


Reflections

“চ্যাটজিপিটি এবং মানবিক বাস্তবতা”

CHATGPT কিংবা এরকম কিছু AI নিয়ে একাডেমিক মহলে একটা হৈচৈ চলছে। তবে উন্নত বিশ্বের হৈচৈ এখন অনেকটা বিশ্লেষণ আর পলিসির পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং কিভাবে শিক্ষায় AI অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ হয় এ নিয়ে পরিস্কার দিকনির্দেশনা দেয়া হচ্ছে এবং সেই সাথে এই দিকনির্দেশনা না মানার ফলাফল শিক্ষার্থীদের মানতে এবং বহন করতে হচ্ছে। AI এর উপযুক্ত ব্যবহার নিয়ে ও চলছে নানা প্রশিক্ষণ কর্মশালা যাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এবং গবেষকরা নিজেদের হিউম্যান পটেনশাল সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে পারেন।

AI এর ব্যবহার নিয়ে একটি এনালোজি প্রশ্ন আকারে বার বার আমাদের সামনে আসে। যেমন, আপনি কি এমন বিমানে চড়বেন যে বিমানের পাইলট তার কোর্সে প্রতিটি আসাইনমেনট AI দিয়ে প্রস্তুত করতো? এরকম পাইলট কি আসলেই বিমান চালনার জন্য দরকারি সব স্কিল অর্জন করতে পারে? তার হাতে যাত্রীরা কতটুকু নিরাপদ?

কিংবা আপনি কি এমন ডাক্তারের কাছে যাবেন যে পড়ালেখা না করে সবকিছু AI CHATGPT দিয়ে করিয়ে ডাক্তারী পাশ করে রোগীর চিকিৎসা সেবায় নেমেছে? এই ডাক্তার কি বুঝবেন সঠিকভাবে কি হচ্ছে কেন হচ্ছে? তার নিখুঁত আসাইনমেনট কিংবা উচ্চ নম্বর কি রোগীর উপকার করবে?

ব্যপারটা ভাবনার এবং মজার। আপনি হয়তো বলবেন, ওকে ক্রিটিক্যাল সেক্টরে AI-induced শিক্ষাপদ্ধতি চলবে না। বাকিগুলোর কি সমস্যা? AI কে বললে একটা আর্টিকেল লিখে দেবে, একটি বুক রিভিউ করে দেবে, একটা এচে লিখে দেবে, এবং এভাবে কবিতা গল্প উপন্যাস সব সব…তো!

তো আপনার কাছে একটা প্রশ্ন, আপনি তাইলে কি জন্য আছেন এখানে? আপনার কাজ কি? একটা রোবট কি আপনার রিপ্লেসমেন্ট?

ইমোশনাল প্রশ্ন আপার্ট, আসলে কি AI CHATGPT উপরে উল্লেখিত কাজগুলো আপনার মতো করে করে দেবে? আমার অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান হলো, না করে দেবে না। এই রোবট তা পারে না।

আপনারা যারা এগুলো নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন তারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, CHATGPT এর সমস্যা এবং লিমিটেশনগুলো:

১. সে কোন টপিকসের সুক্ষ, গভীর, এবং চিন্তাশীল বিষয়গুলো ধরতে পারেনা। যেমন, আপনি একটি আর্টিকেলের সামারি দিতে বললেন, সে ভাসা ভাসা কিছু আইডিয়া দিতে পারে কিন্তু মূল যে কম্প্রিহেনসিভ আইডিয়া সেটা দিতে পারে না। এখানেই গবেষকরা থমকে দাঁড়ায় এবং বিরক্ত হয়। এবং কেউ যদি এভাবে কিছু প্রডিউস করে জমা দেয়, আমি ক্লিয়ারলি বুঝতে পারি এটা CHATGPT লিখেছে এবং সেজন্য কোন ডেপথ নেই।

২. সে অনেক সময় খুব ডিসেপ্টিভ। বিশেষ করে সোরস এবং রেফারেন্সের ব্যাপারে। যেমন, ধরেন আপনি একটা লেখার কমান্ড দিয়েছেন, সেটা লিখতে গিয়ে সে পর্যাপ্ত পরিমাণে রেফারেন্স পাচ্ছে না বা অনেক জটিল আইডিয়া ( যেমন Michel Foucault দিয়েছে) পেনিট্রেট করতে পারছে না, তাইলে সে এক সোরসের সাথে আরেকটি লাগিয়ে মিথ্যা একটা রেফারেন্স দিয়ে দেবে। নতুবা নিজের মতো রেফারেন্স বানাবে। এগুলোকে বলা হয়, confected আইটেম। তো এটা এই বস্তুকে unreliable করে ফেলেছে।

৩. ChatGPT র ভাষা খুব লিমিটেড এবং মেকানিকেল। এর কিছু ভোকেব আছে ব্যস! যা-ই লিখবে ওগুলো দিয়ে ই লিখবে। তাই ওর ভাষা খুব মোনোটোনাস। তাই এর ব্যবহার একজন শিক্ষার্থীর একজন লেখকের (যে কোনো বিষয়ে লেখাকে) মনোটোনাস করে তোলে।

৪. আপনি একে দিয়ে কবিতা লিখাতে পারবেন। কিন্তু এতটা ড্রাই আর মমতা হীন পাবেন যে আপনার কবিতা জিনিসটার উপর মন উঠে যাবে। যেমন, আপনি যদি নিজচোখে একটি জায়গা দেখেন আর তারপর তাকে নিয়ে ওকে লিখতে বলেন, আপনি যা দেখেছেন সে কোনদিন সেটা লিখতে পারে না। সে কিছু গাছপালা আর প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা বলে ক্ষান্ত দেবে। যে কোন ক্রিয়েটিভ কাজে সে ইমোশানাল ইন্টেলিজেন্স আনতে পারে না।

৫. আপনি তার কাজে বিরক্ত হয়ে যতবার কমান্ড দেবেন ঘুরে ফিরে সে একি জিনিস নানা ভাবে আপনাকে দেবে। পরে সব মিলিয়ে দেখবেন তার এরিয়া একটি সীমানায় বন্দী।

এসব কিছু ভাববার বিষয়। খুব ভাববার। আমি/আমরা কি শিক্ষায় গবেষণায় সৃষ্টিতে আমাকে/আমাদের দেখতে চাই? না একটি রোবটকে দেখতে চাই? একটি রোবট কি আমার সহযোগী হবে না আমার অল্টারনেটিভ/ আমার ছায়া/ আমার কাউন্টার-সেলফ হবে?

আমার ক্ষেত্রে “আমি” ( sense of self) খুব গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ আমাকে সৃষ্টি করেছেন যে বৈশিষ্ট্য দিয়ে সেগুলো নিয়েই এই আমি। আমি এই “আমি” কে ইকসপ্লোর করতে চাই।

তাই CHATGPT আমার কাছে অন্যকোন অনলাইন টুলস থেকে বেশি কিছু না। আমি একটি ভ্যাকুয়াম মেশিন যেমনে ব্যবহার করি, একেও এমনে ব্যবহার করতে চাই। এটা যেগুলো পরিস্কার করতে পারে না, আমি অন্যভাবে অন্যকিছু দিয়ে পরিস্কার করি। আমার কাছে মানুষের emotional agency, capabilities, and intelligence নাম্বার ওয়ান। সেগুলো খাটিয়ে বুদ্ধিভিত্তিক এবং সৃষ্টিশীল হবার বিকল্প নেই।

উম্মে সালমা, ১০/১/২০২৫

Reflections

From Reading to Reality

Sometimes, I reflect on the words “colonialism” and “postcolonialism,” words I became familiar with quite an early age through postcolonial literature. When I was saturated with mainstream English literature after my youth with Bangla literature, this familiarity blew my mind. My heart was thrilled to see the pages of fiction and poems full of people like me and to find them conversing about issues that confront me in everyday life in society, culture, and politics. I felt like, “Wow, at last, this is me, this is us here, on the pages.” A sense of absence which pricked me always while immersing in Shakespeare, Jane Austen, Milton, Wordsworth, or Shelley proved to be fulfilled by Amitav Ghosh, Anita Desai, R K Narayan or Chinua Achebe. The complex family drama, the life in cultural domesticity, and everyday tension in relationships surrounded by overarching colonial and postcolonial politics warmed the cockles of my heart.

I learned to look beyond my life’s geography. I learned that the 200 years of British reign in Bengal had drastically changed its linguistic, social, cultural, economic, and political landscapes. The old Mughal system, which mostly kept the traditional agrarian Bengal life untouched, has been replaced by all-pervading British rules as well as modern and enlightened world concepts. These concepts made the Bengalis conscious of their rights over their land. The outcome of this consciousness was their struggles, fights, and resistance against British power, and eventually, they won independence with the departure of the British from the Indian subcontinent.

Although this is a very simple summary of my very complicated learning process in the field of colonialism and postcolonialism, this is the gist, a bird’s eye view, which I learned and internalised. This internalisation is also accompanied by a rhetoric of dreams of a better life in the independent land, a dream that our forefathers nourished throughout their lifetimes. My forefathers particularly roamed the Indian subcontinent for their jobs, but eventually, they returned home to their agrarian village to live a happy, peaceful life. To them, their calm and quiet village was their ultimate hub. They did not expect much from life but a pretty modest life and a peaceful death in an independent country after having a life of hard work and good earnings.

However, these dreams and expectations, laced with colonialism and independence, seem to me very expensive in 21st-century Bangladesh. This is unreachable for the contemporary Bangladeshi people. The door of the dream the postcolonial world opened in front of our forefathers was closed so long ago, not by the so-called foreign rulers, but by the local elitist, power mongered, and greedy rulers.

The more I look at the history and culture of the current ousted fascist government’s money laundering, the more my so-called questioning of the British colonisers gets softened. “Hey, look at yourself before looking at the others. Hey, turn a mirror to yourself before posting a mirror to the foreigners.” At the same time, the current instability after the July movement, the rhetoric of mercy and softness, the character assassination of the leading figures, and efforts to rehabilitate the fascist supporters prompt me to question: “Do Bangladeshi common people not have rights to dream of a peaceful modest life at their homeland?” “Do Bangladeshi common people not have rights to die a peaceful death on their forefathers’ land?”

All these remind me of the old Bengali proverb, “If you spit over your head, it will fall on you.” So, when I spit, I get spitted. When I get spitted, I remember all unjust actions align with unjust actions irrespective of time, place, and people. And this remembrance is the burden I carry through my colonial, postcolonial, and neo-colonial learning journeys.

Umme Salma
15/11/2024

Reflections

স্বমন্বয়ক হান্নানের কান্না: কি ভাবছি!

“বাড়ির পাশে আরশিনগর
সেথায় এক পড়শী বসত করে
আমি একদিন ও না দেখিলাম তারে…”

এই গানটি নিয়ে কলেজ জীবনে একসময় তুমুল আলোচনা হয়েছিল কবিতা পড়া এবং কবিতা লেখা বন্ধু মহলে। কিশোরী কাল। নতুন নতুন আধ্যাত্মিকতার সাথে পরিচয়। কেমন কেমন লাগে এইসব গান শুনলে তাদের বুঝতে চেষ্টা করলে। তার মধ্যে কেউ যদি বলে, এই জানিস “আরশিনগর” মানে কি এই গানে ? মানে হলো মন/রিদয়। বল, তোর মন/রিদয় তোর সাথেই তো আছে, তাকে দেখেছিস? কখনো ?

আরশিনগর দেখিনি, সত্যিই দেখিনি, ইমাম গাজ্জালীর মতো কলবের সন্ধান করতে করতে বুঝতে পারিনি রিদয়/কলব/মন হলো দৃশ্যমান হৃৎপিণ্ডের একটি ফাঁকা জায়গা। কিন্তু এতটুকু বুঝতে পারি রিদয় নামক জায়গা হতে উৎসারিত না হলে স্বমন্বয়ক হান্নানের মতো কেউ কাঁদতে পারেনা, কেউ মনের ভেতর গুমরে থাকা ভাষা বাকরুদ্ধ কন্ঠস্বর এবং চোখের জলে এভাবে ঢেলে দিতে পারে না।

ক্লান্ত বিকেলে তার কান্না দেখে আমি না কেঁদে পারিনি।

এতটুকু জীবনে কম দেখলাম না, কৈ কখনো তো কাউকে তো দেশের জন্য এভাবে কাঁদতে দেখিনি?

ওর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা রেজাল্টের অপেক্ষার পর ভালো ক্যারিয়ার ছিল আমার স্বপ্ন। দেশের জন্য মাঠে নামবো রাস্তায় নামবো ধার্মিক ভালো ছাত্রী হয়ে মেয়ে হয়ে (কিংবা ভালো ছাত্র ছেলেটা হয়ে)? অসম্ভব…বাবা মা পরিবার পিটিয়ে আমাকে চেপ্টা করে ফেলতো। কারণ রাজনীতি খারাপ জিনিস। ঘরে বাইরে সবখানে সবসময় একটা highly protected cocoon ছিল। সীমানা দেয়া ছিল। এটা করবে ওটা করবে না। ঐ যে ঐটা তোমার জন্য। এটা পাবার জন্য চেষ্টা কর।

আর এই ২০১৮ এর স্টুডেন্টরা, ২০২৪ এর হান্নানরা বুদ্ধি হবার পর থেকে স্বৈরাচারী শাসনের habitus থেকে এ স্বৈরশাসনতান্ত্রিক আদর্শ উদ্দেশ্য উদাহরণের পুনঃ পুনঃ ব্যবহারের (reiteration) পরো কেমন যেন একটা স্বাধীন স্বচ্ছ পরিস্কার চিন্তা আর আবেগ নিয়ে বেড়ে উঠেছে এবং তার জন্য জীবন বাজি রেখেছে!

সেই তারা যখন হিউমিলিয়েটেড ফিল করে, তাদের অশ্রু সত্যি বহন করতে পারিনা!

হান্নানের কান্না আর কথা আমি শুনছিলাম আর শুনছিলাম। সাহিত্য পড়তে পড়তে বিশ্লেষণ করার যে চোখ সেটা মাথায় খেলা করছিলো। মিলান কুন্ডেরার The Unbearable Lightness of Being এ একটি কনসেপ্ট শিখেছিলাম, kitsch (কিছ)। একটু অদ্ভুত কিন্তু মজার।

এর অর্থ হলো “art, objects, or design considered to be in poor taste because of excessive garishness or sentimentality, but sometimes appreciated in an ironic or knowing way.” (source: Google)

যখন কোন চিত্র ছবি বস্তু অতিরিক্ত আবেগ, সেন্টিমেন্ট, এবং শোঅফ দেখানোর কারণে খুব বাজে রুচির পরিচয় দেয় তাকে বলে, “Kitsch” ( কিছ্)। মানুষ মুখে মুখে প্রশংসা করে এইসব কিন্তু জানে এটা ফেইক। এটা নিম্ন রুচির কাজ।

একটি উদাহরণ দেয়া যাক। যেমন ধরুন, একজন পলিটিশিয়ান গরীব বাচ্চাদের কিছু দান করছে এবং সাংবাদিকদের সব ক্যামেরা তার দিকে তাক করা। তখন সেই পলিটিশিয়ান এমনভাবে মানবহিতৈষী চেহারা করলেন এবং আবেগঘন কণ্ঠে কথা বলতে লাগলেন যা তার স্বভাবসুলভ না। তিনি এটা করছেন কারণ তিনি জানেন এটা নিউজ হবে। মানুষের কাছে তার একটি ভালো ইমেজ তৈরি হবে।

মিলান কুন্ডেরা এই ধরণের সব কাজ ছবি ইমেজ সবকিছুকে বলেন “kitsch” বা tasteless and vulgar ছবি।

তো হান্নান যখন কথা বলতে বলতে তার কষ্টের আবেগের অভিযোগের পিকে উঠেছিলো, আমি তাকিয়ে ছিলাম। আমি বুঝতে চাইছিলাম ফ্যাসিবাদের জননীর মতো তার কান্না ফেইক কিনা।

কিন্তু না, তার কান্না খুব খুব রিদয়প্রসূত। এখানে কোন অভিনয় নেই কোন রিয়া নেই কোন লোকদেখানো নেই স্বার্থ নেই। এটা কোন “kitsch” নয়, এটা একটি ভয়ংকর সুন্দর পবিত্র সৎ অভিব্যক্তি। ভীষণ ছোঁয়াচে। বাংলাদেশের হাতিয়া উপদ্বীপ হতে উঠে আসা এক বাঙালি মুসলমান তরুণের চাহিদার চিহ্ন।

স্বাধীনতার তিপান্ন বছর পর কলকাতার ভাষায় নয় ঢাকা এলিটদের ভাষায় নয় দেশভাগের পর আসা মাইগ্রেন্টদের ভাষায় নয়, তাদের পোশাক আশাকে নয়, ফিটফাট ফুলবাবু হয়ে নয়, আঞ্চলিক আর শুদ্ধের দ্যোতনায় গড়া একদম ক্যাজুয়াল দেশীয় পোশাকে এক ছেলে বলে যাচ্ছে তাদের অপমানের কথা তাদের স্বপ্নের কথা স্বপ্ন ভাঙার আওয়াজের আয়োজনের কথা।

প্রবাসী আমি, প্রভিলিজড আমি, না কেঁদে পারিনি। আমার বিশ্বাস এদের কথা যারা বুঝতে চাইবে না, ওদের ভয়েসকে দাবিয়ে দেবে, এদের অপমান করবে, এদের স্বপ্নের সাথে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে, এই অমিত সম্ভাবনাকে ঈর্ষা করবে, তাদের উপর প্রাকৃতিক প্রতিশোধ নেমে আসবে। আসবেই।

উম্মে সালমা
৮/১১/২০২৪

Reflections

সত্য বলার সাহসকে সাধুবাদ

প্রিয় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ,

গতকাল আপনার দ্রব্যমূল্য বিষয়ক সাহসী বক্তব্য শুনলাম। শুনে মনে হলো একটি নতুন সংগীত শুনছি, এমন একটি সংগীত যা বাংলাদেশের একজন শিল্পী এখনি লিখেছেন এবং এখনি সুর দিয়েছেন। মনে হলো এই এতটুকু জীবনে এমন সংগীত বাংলাদেশের কোন শাসকের প্রতিনিধিদের মুখে শুনিনি। মনে হলো একটি নতুন সূর্য উঠছে একটি নীল দিগন্তে, চারপাশ ঘিরে থাকা শত সহস্র বছরের দুঃসহ অন্ধকারকে পরাজিত করতে করতে…

এই যে সাহসী হয়ে বলা প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাব, এই যে পরিস্কার করে বলা অলস চাটুকারিতা আগের সময়ের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়ে উঠা এবং সেই সাথে ওয়ারণিং দেয়া যে আমরা সিন্ডিকেট ভেঙে দেবো বিশ্বাস করুন ভাই এখানে আমি এই ধরণের কথা আমার এই জীবনে দেশের মাটিতে কাউকে বলতে শুনিনি । আর এখানে আমি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই। আমি যেন শুনতে পাই যুগের শার্দুলের কন্ঠ যারা যুগে যুগে দুঃশাসনের স্থানে সুশাসনের জন্য লড়াই করেছে। আমার মন আনন্দে নেচে ওঠে যেন আপনারা এক এক জন বখতিয়ার ঘোড়ায় চড়ে আসছেন দুঃখভরা বাংলার আজীবন সংগ্রামরত মানুষকে শান্তির বাণী শোনাতে। এই সময়ে এই একবিংশ শতকে।

আমি দূর প্রবাসী একজন ক্ষুদ্র শিক্ষক এবং গবেষক। আমি রাজনীতি বুঝি না। রাজনীতি করি না। কিন্তু আমার পরিবার আমার আত্মীয় স্বজন আমার দেশের সাধারণ মানুষেরা যখন বাজারের উত্তাপে জ্বলে পুড়ে মরে এবং বার বার আয় আর ব্যয়ের হিসাব মিলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে থাকে আমার খুব কষ্ট হয়। আমি যখন দেখি এখানে এই বিদেশে একজন সাধারণ মানুষ পর্যন্ত একটা আয় আর ব্যয়ের সামঞ্জস্যতা নিয়ে জীবন যাপন করে, যখন দেখি এখানকার সরকারের মানুষেরা জনগণের জীবন যাপন সহজ করতে প্রতিনিয়ত চেষ্টা সাধনা করতে থাকে, আমার নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। মনে হয় কেন আমার জন্মভূমিতে এরকম শাসক আসে না? কেন শাসক হওয়া মানে “বিকামিং এলিট” এবং তারপর “রুল অফ এলিট”? একপক্ষ ধুঁকে ধুঁকে মরে আর আরেক পক্ষ ঝলমলে আলো ছায়ায় অর্থ সম্পদের পাহাড়ে ফূর্তিতে লিপ্ত থাকে?

এত সবের মাঝে একদল প্রজ্ঞাবান তরুণদের সংগ্রাম করে উঠে আসা জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে, আমি মেসমেরাইজড হয়ে যাই।‌ কিভাবে সম্ভব? এত সবের মাঝে একদল চিন্তক তরুণদের ইতিহাসের ইনসাইটফুল ইনক্লুসিভ পুনঃপাঠ আমাকে অভিভূত করে।‌ এত সবের মাঝে পুরোনো অন্যায় অভ্যাস আর অভিপ্রায়ের ধারা ভেঙে দিয়ে আপনাদের মতো একদল তরুণের অসম্ভব সাহসী উচ্চারণ” আমরা ভেঙে দেবো” শুনে আমি কুল কিনারা পাই না। কিভাবে সম্ভব?

এইতো সেদিন ও মনে হতো এভাবেই জীবন যাবে। দেশের কোন ভবিষ্যত নেই । মনে হতো নিজের সন্তান্দের একটি সুন্দর দেশের গল্প বলতে পারবো না। এভাবেই রুটলেস হয়ে বিদেশে আমাদের বাচ্চারা মানুষ হবে আর দেশকে একটা সাময়িক বেড়ানোর জায়গা ছাড়া কিছু ভাবতে পারবেনা।

ঠিক সেই সময়ে…আপনারা দেশ, ইতিহাস, শাসন নিয়ে এমন কিছু কথা বলছেন…স্বৈরাচারের বয়ান ভেঙ্গে দিচ্ছেন আমরা সত্যই অবাক হয়ে পড়ছি। যে কথা আমরা বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুরছি বলতে পারি নি, যে কথা কিভাবে বলবো যেটা বুঝতে আমাকে গবেষণার একটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, সে কথা আমাদের ছোট ছোট ভাইয়েরা আমাদের পর পর এসে বলে দিচ্ছে এবং সে সব কথা বাস্তবায়ন করবে বলে সাহসী বক্তব্য দিচ্ছে, এটা দেখে সত্যি সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে মাথানত হয়ে আসে। ইতিহাসের যতটুকু পাঠ আছে মানব সভ্যতার ইতিহাসে যখনি জুলুম নির্যাতন অন্যায় বেড়ে গেছে যখনি মজলুমের যন্ত্রণা কান্না রক্ত মৃত্যু অসহনীয় হয়েছে তখনই আল্লাহ এমন একদল লোককে তার জমিনে পাঠান এই জমিনকে বিপর্যয় হতে রক্ষা করতে। এটাই আল্লাহর নিয়ম। তিনি মানুষকে একেবারেই ছেড়ে দেন না।

আপনারা কতটুকু সফল শেষ পর্যন্ত হবেন জানি না, তবে আমি বিশ্বাস করি এবং বিশ্বাস করতে চাই আপনারা সেই সাহসী একদল যারা অন্যায়কে রুখে দিয়ে এর বিস্তৃত ডালপালাকে কেটে ফেলার হিম্মত রাখেন। আপনারা ইতিহাসের সঠিক দিকে আছেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে তাদের জীবন স্বস্তির ছায়া নামানোর সাহস রাখেন।‌ আর এইটা যখন ভাবছি এখন এইসব বলছি এর মানে এই না যে আমি চাটুকারিতা করছি কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার জন্য। এই জীবনে কোনদিন কাউকে তেল দিয়ে এই পর্যন্ত আসিনি এবং সামনে ও কোনদিন যাবো না তেল দিয়ে কিছু পাবার জন্য। (মেধা আর মাথা উঁচু করে যে জীবন দাঁড়িয়েছে সে কবর পর্যন্ত আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নত হবে না।)

কেন লিখছি তবে? লিখছি যেন এই দিনগুলো লেখার মাধ্যমে থেকে যায়। যেন পরবর্তী সময়ে পরবর্তী প্রজন্ম জানে কি করে ২০২৪ জুলাই বিপ্লব মানুষের মনে আশা আর স্বপ্ন জাগিয়েছিল। কিভাবে কিছু তরুন তরুনী দেখিয়ে দিয়েছিল, “এখন যৌবন যার যুদ্ধ করার তার শ্রেষ্ঠ সময়” । কিভাবে প্রবাসী নারীরা যারা নিজেদের জীবনে বেঁচে থাকার সব উপকরণ থাকার পরও দেশের জন্য ভাবতো এবং ভালো কাজের পৃষ্ঠপোষকতা করতো তাদের লেখণী দিয়ে।

আপনাদের হাত ধরে এই মাইনাস প্রান্তের দেশটি একটু একটু করে উঠে আসুক। স্বপ্ন সত্যি হোক। সাধারণ মানুষ ভালো থাকতে শুরু করুক। আজকে খুব মনে পড়ছে আমার এক বড়বোন সহ শেখা একটি কবিতার কিছু লাইন…

“পাথরে পারদ জ্বলে
জলে ভাঙে ঢেউ
ভাঙতে ভাঙতে জানি
গড়ে যাবে কেউ
তন্দ্রার আচ্ছাদন ছেঁড়ে এসো আমরা জেগে উঠি
এসো আমরা গড়ে তুলি আরেক পৃথিবী
গড়ে তুলি প্রজন্মের সাহসী তুফান…”

উম্মে সালমা , ২০/১০/২০২৪, টুঅং