সূরা বাকারা পড়তে গেলে কিছু আয়াতে সবসময় চোখ আটকে যায়। আয়াত গুলো হলো আট থেকে বিশ। যতবার পড়ি ততবারই মনে হয় এই উপমা আর রুপকতা মন্ডিত কথাগুলো সত্যি কি আমি বুঝি? উপমা নিয়ে রিসার্চ করা আমি বারবার ফিরে ফিরে যাই আয়াত গুলোতে। দেখতে চাই কি ভীষণ জীবন্ত সেই মেটাফোরিকেল ইমাজারি, চোখের সামনে ভেসে ওঠে আবার হারিয়ে যায়, মনে হয় এ দৃশ্য আমি কোনদিন দেখেনি বলেই কি এটা একসাথে ভয়, বিষাদ, আর হাহাকার তৈরি করে?
আয়াতগুলোর সরল অনুবাদ বা আরবী ভাষা জানা সবার কাছে অর্থ একেবারেই পরিস্কার। আলীফ লাম মীম ( মাদ দিয়ে টেনে পড়ুন) দিয়ে শুরু হয়ে দুই থেকে সাত নম্বর আয়াত পর্যন্ত কুরআনকে মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে এই মানুষরা কি কি বৈশিষ্ট্য থাকলে মুত্তাকী হতে পারে। সেই সাথে বলা হয়েছে যে সব মানুষ এসব মেনে নিতে পারেনা, তাদের সাবধান করলে ও কিংবা না করলেও তারা মেনে নেবে না। বারবার নিজের অন্তরের গভীরে থাকা আল্লাহর অস্তিত্ব রেখে ঢেকে রাখার কারণে আল্লাহ একসময় তাদের মন এবং কানের যে বুঝক্ষমতা তা সিলগালা করে দিয়েছেন। তাদের চোখের উপর এখন একটি আবরন পড়ে গেছে । তারা আর কিছুই অনুধাবন করতে পারবেনা।
কিন্তু ম্যাজিকেল আয়াত গুলো তার পর পরই। আল্লাহ তারপরি দুই দল মানুষের কথা বলেছেন। তিনি তুলনা করছেন ঈমান এবং কুফরকে কে একটি ব্যবসা হিসেবে। ব্যবসা বাণিজ্য একটি লেনদেন লাভ ক্ষতিকে ঘিরে আবর্তিত। এই ব্যবসায় মানুষ যে পন্য দুটো কিনতে পারে বিক্রি করে মুনাফার জন্য সেগুলো হলো: হেদায়েত আর গোমরাহী। যারা আল্লাহ প্রথম সাত আয়াতে মুত্তাকীদের যে বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন তা অস্বীকার করে তারা কিনে নেয় গোমরাহী। জীবনভর এই ব্যবসা বাণিজ্য করতেই থাকে। শেষ পর্যন্ত দেখে, হায়! তার ব্যবসায় মারাত্মক ক্ষতি আর ধ্বস।
সবচে ইন্টারেস্টিং যে বিষয় হলো এই মানুষরা আসলে কারা। তারা কি এমন করে যে তাদের ব্যবসা যে অলাভজনক হয়? এটা বুঝতে গিয়ে আমার চোখ আটকে যায় জন্য তিনটি শব্দের দিকে: প্রতারনা, নির্বুদ্ধিতা, আর ঠাট্টা। প্রতারনা কি? যা দেখি যা দেখায় তা যখন মিথ্যে হয় তখন তাকে প্রতারনা বলে। এসব মানুষ মুখে মুখে বলে তারা আল্লাহ যা যা বলেছেন সব বিশ্বাস করে। কিন্তু আসলে তা নয়। তাদের কাজ প্রমান করে তারা অন্যরকম। কিন্তু তারা স্বীকার করতে চায় না। জমিনের উপর সব ধরনের বিপর্যয় করতে থাকে আর জিজ্ঞেস করলে বলে, তারাতো সবার ভালো চায়। তারা জমিনকে শান্তিতে ভরিয়ে রাখতে চায়।
তারপর আরেকটা ধাপ অতিক্রম করে তাদের যদি বলা হয় ঈমান আনো। এরা নিজেদের বুদ্ধিমান বলে দাবি করে। আর ঈমানদারদের বলে নির্বোধ। আসলে বোকা বা নির্বোধ কে? যার বুদ্ধি কম। যারা বুঝে না। এরা ভাবে আরে আমরাতো বুদ্ধিমান, আমরা কেন এ কাজ করবো? যা দেখিনা তা বিশ্বাস করবো? নিজের টাকা থেকে অন্যের জন্য খরচ করবো? নো ওয়ে।
এর পরেরটা হলো, ঠাট্টা করা। উপহাস করা। এরা সময় সময় যখন ঈমানদারদের সাথে মেশে, বলে আমরা তোমাদের সাথে আছি। আবার যখন তাদের মতো লোকের সাথে বসে বলতে থাকে, ওদের সাথে তারা মজা করছে। তাদের চোখে মুখে থাকে আত্মতৃপ্তির আভা। তারা জোক আর মোক করতে পেরে হেসে লুটোপুটি খায়।
এই দৃশ্য যখন আমার মনের চোখ দেখে আমার বুক কাঁপে। আমি কি এদের মতো কেউ? নিজেকে খুব বুদ্ধিমতি ভাবি আর প্রতারণা করি ঠাট্টা করি সত্যের সাথে? এর অনূভুতি তীব্র হয় যখন উপমাতে এসে থেমে যাই। আমি দেখি, এক লোক আলো জ্বালছে। সে আলো জ্বালাতে কত কিছুর আয়োজন করলো। আলো ও জ্বলল। কিন্তু আলো দেখার আগেই তার চোখ অন্ধ হয়ে গেল। এখন চেরাগের বাতি হোক কিংবা ইলেকট্রনিক লাইট সে কিছুই দেখতে পায়না।
অথবা খুব ঝড় বৃষ্টির রাত। বিদ্যুত চমকাচ্ছে। এক লোক এর মধ্য দিয়ে পথ চলছে। বজ্রপাত আর বিদ্যুৎ চমক হলে সে এত ভয় পায় সাথে সাথে কানে আঙ্গুল দেয় এবং চোখ বুজে ফেলে। আবার যখন ওসব একটু থামে একটু আলো ঝলকানি দেয় সে একটু হাঁটে। তারপর আবার ভয় পায় এবং আবার থামে। আবার একটু চলে। আবার থামে। এই অবস্থায় যদি এমন হয় যে বিদ্যুৎ তার চোখের দৃষ্টি ছিনিয়ে নেয়, সে কি করবে?
আল্লাহ বলছেন, এই হলো এই অলাভজনক ব্যবসায়ে নিমজ্জিত লোকদের জীবন। এরা ভাবে আমার চোখ আমার মন আমার কান সবকিছু আমার। এরা ভাবে আমি যেমন চাই তেমনি আমার এই শরীর কন্ট্রোল করতে পারি। আমার জীবন নির্বাহ করতে পারি। আসলে কিন্তু তা নয়। অন্ধকার রাত কিংবা ঝড় বৃষ্টির রাতের মতো আমাদের এই জীবনে আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। তিনি চাইলে আমাদের চোখের দ্যুতি নিয়ে নিতে পারেন আমাদের পথ থমকে দিতে পারেন আমাদের বুঝক্ষমতা কেড়ে নিতে পারেন।
কিন্তু তিনি গোমরাহীর বিজনেস ম্যাগনেটদের সাথে তৎক্ষণাৎ তা করছেন না। তিনি তাদের অবকাশ দিচ্ছেন। দেখছেন নিজেকে ধোঁকা দিয়ে নিজের সাথে ঠাট্টা করে শেষ পর্যন্ত এই মানুষেরা কোথায় গিয়ে পৌঁছায়। তাদের বিদ্রোহ তাদের কত দিন তাদের উদ্ভ্রান্ত করে রাখে।
এখানে এসে আমি আবার থমকে যাই। হে প্রভু!কেন সব মানুষকে তুমি হেদায়েতের ব্যবসা বাণিজ্য করতে দাও না? তখনি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে মানুষের এজেন্সির আইডিয়া। মানুষের আছে ইচ্ছাশক্তি। আছে ইনটেনটেনশন, ডিসিসান নেবার এবং পছন্দ করার ক্ষমতা। যে এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে গোমরাহীর ব্যবসা করছে, তাকে জোর করে হেদায়েতের ব্যবসা বাণিজ্যে লাগানো কি ইনজাষ্টিস নয়? ইচ্ছা স্বাধীনতার অবমূল্যায়ন নয়? ইনইকুয়ালিটি নয় ? ইনিকুইটি নয়? এটা কেমনে হয় একটা মানুষের কমলালেবুর চাহিদা নেই, আর আমি তাকে জোর করে কমলালেবু খাওয়াচ্ছি…
মানুষদের কুরআন একদম শুরুতে মানুষকে (আই রিপিট, মানুষ নামের প্রাণীটিকে, বিশ্বাসীদের না, মুসলিমদের না) ডাকছে। ডেকে ডেকে বলছে, “দেখো, তুমি চাইলে এরকম হতে পারো। চাইলে ওরকম হতে পারো। তুমি হলে গিয়ে ব্যবসায়ী। সিদ্ধান্ত নাও তোমার প্রভুর সাথে তুমি কি নিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করবে। কি পন্য কিনে তুমি তোমার জীবনের দোকান সাজাবে, জীবনের মার্কেটে কি দ্রব্য তুমি লেনদেন করবে? The choice is yours. You can use your full potential to do anything ( mocking, deciting, or priding). But keep in mind, Allah is in the rear.”
কুরআন আমাকে বলে, আপনাকেও কি? আসুন একটু ভাবি।
উম্মে সালমা, ১২/৩/২০২৪
