
যেখানেই আপনার আমার মৃত্যু সেখানেই মৃত্যুর দূত আমাদের হাতছানি দিয়ে ডেকে ডেকে নিয়ে যাবে। যেদিন সিদরাতুল মুনতাহা ‘র পাতা ঝরে যাবে তার থেকে গুনে গুনে চল্লিশ দিন তারপর মৃত্যুর পথে পদযাত্রা শুরু। এক ঘন্টা এক মিনিট এক সেকেন্ড এক অনুপল আগানো কিংবা পেছানোর সুযোগ নেই। আপনি সেই নির্দিষ্ট সময়ে যা ই করেন না কেন: ঘুমিয়ে থাকুন, রাস্তায় থাকুন, ঘরে থাকুন, কাজে থাকুন, হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে বক্তৃতা বা গান বা কবিতা গাইতে থাকুন, কিংবা আরো আরো অনেক অনেক কিছু, মৃত্যুর দূত আমাকে আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকলে সেই ডাক উপেক্ষা করার মতো ক্ষমতা আমাদের দেয়া হয়নি।
এই সত্য যদি বারবার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা যদি কোন সুপার পাওয়ারের না থাকতো তাহলে কেন একটি নিষ্পাপ শিশু দশতলার ছাদে খেলতে গিয়ে খেলার এক পর্যায়ে ছাদের টিনের উপর ওঠা মাত্রই টিন ভেঙে দশতলার নীচে পড়ে যাবে? এক সেকেন্ডে জীবন নামক এত মায়া এত মজা সবকিছু শেষ হয়ে যাবে? যতবার সিসিটিভি ফুটেজ দেখছি ততবার অবাক হয়ে দেখছি দশতলার টিনের চালে উঠতে গিয়ে মেয়েটি প্রথমবার পা পিছলে গেল। সে উঠতে পারল না। কিন্তু সে থামলো না। দ্বিতীয়বার আবারো কষ্ট করে টিনের চালে উঠে পড়লো এবং এক সেকেন্ডে পুরোনো টিন ভেঙে একদমই নীচে… ইন্নলিল্লাহ ওইন্নাইলাহি রাজিউন।
সে চাইলেই কি এই মৃত্যু থেকে রেহাই পেতো? আমি বিশ্বাস করি, না। ঐ পাশে মৃত্যুর দূত তাকে ডাকছে। দুনিয়ার সফর শেষ করতে হবে। জান্নাতের বাগান প্রস্তুত। তার বাবা মায়ের পরীক্ষার ক্ষেত প্রস্তুত। তো আর কিসের অপেক্ষা?
সুলাইমান আঃ এর সময়কার ঘটনা। আজরাইল আ: কে পাঠানো হলো এক ব্যক্তির রুহ কবজ করার জন্য। আজরাইল এসে দেখে তার মৃত্যু যেখানে হবার সেখানে সে নেই। তো আজরাইল আ আল্লাহর কাছে ফিরে গেলেন এবং জানতে চাইলেন, তিনি কি করবেন? ঐ লোক তো তার জায়গায় নেই। আল্লাহ বললেন, তুমি চিন্তা করো না সে সেখানে পৌঁছে যাবে। তুমি সুলাইমান আঃ এর দরবারে যাও। মৃত্যুর দূত সেখানে চলে গেলেন এবং মানুষের বেশ ধরে সুলাইমান আঃ এর দরবারে সবার সাথে বসে রইলেন আর মানুষটির গতিবিধি খেয়াল করছিলেন। অন্যদিকে মানুষটিও একটু অবাক হয়ে ভাবছিলেন, ঘটনা কি? লোকটি আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? তিনি ভাবলেন, না আর বসে থেকে লাভ নেই। দেশে ফিরে যাই। তিনি সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হয়ে চলে গেলেন এবং তার দেশের পৌঁছার পর পর মৃত্যু বরণ করলেন। আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া বন্দোবস্ত কি করে বাস্তবায়ন হয় এই ঘটনা আমাদের সামনে রেখে গেলেন যাতে আমরা যেন মৃত্যুর অনিবার্যতা জীবনের পাশাপাশি ধারণ করি।
এত কথা বলার একটা ই কারণ নিজেকে এবং আমার আত্মীয় স্বজনকে, বিশেষ করে সন্তানহারা বাবা আমার মামা (Nizam Uddin Nizam কে সান্ত্বনা দেওয়া। মনটা কে শান্ত করার চেষ্টা।
ছোট্ট মামনির যাবার সময় এবং পথ এটাই ছিল। এটাই সে তার তকদিরে করে নিয়ে এসেছে। আমাদের এই পরিণতি পরিবর্তনের কোন শক্তি নেই। আমরা কেবল দোয়া করতে পারি, এমন দোয়া যেটা আমাদের শিখিয়ে দেয় দূর্ঘটনাজনিত সমস্ত বিপদ থেকে আল্লাহ যেন আমাদের হেফাজত করেন।
তবে আমরা মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ প্রাণী। আমরা জীবনে আসল কথা ভুলে যাই আর দুনিয়ার জীবন নিয়ে মত্ত থাকি। আমাদের unlimited fun and enjoyment এর ভোগবাদী দর্শন আমাদের ভুলিয়ে দেয়, দুনিয়ার জীবন একটি অপরাহ্ন এবং একটি বিকেলের মতো। আমরা সেই একটি ছোট্ট সময়কে আমাদের নফসের পূজা শরীরের খেলা খেলতে খেলতে পার করে দেই। ভাবি, এই আনন্দ এই জীবন। খাই দাই সাজগোজ করি টাকা পয়সা কামাই আর আনলিমিটেড ফূর্তি করতে থাকি। ভাবি, আমাদের আর পায় কে!
আসলে, এইসব সব ধোঁকা। মৃত্যু জীবনের পাশে পাশে হেঁটে চলছে। একদিন একসময় হয়ত চোখ রাঙিয়ে ভয় দেখিয়ে নয়তো ভালোবেসে হাত ধরে বলবে, চল। যেতে হবে।
সেই দিনটা যেন আমাদের ভালোবাসার হয় আরামের হয় তার জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত? Let’s reflect. Let’s think a moment. Let’s stop a sec and ruminate.
দোয়া করি আল্লাহ ছোট্ট নিষ্পাপ মামণিকে জান্নাতের বাগানের মেহমান করুন আমীন। তার বাবা-মায়ের নাজাতের উসিলা করুন। আমিন।
উম্মে সালমা, ৩০ জুন, ২০২৫.

