ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কবি পারসিবিসি শেলীর “Ode to the West Wind” কবিতাটা কম বেশি সবারই পড়া এবং জানা। কবি তার এই কবিতায় কিভাবে ইংল্যান্ডের পশ্চিমা বাতাস পুরোনো প্রকৃতির সবকিছু পরিবর্তন করে নতুনদের সূচনা করে, সেটা দেখিয়েছেন আর সেই বাতাসকে যে বসন্তের বোন তাকে বলেছেন তাকেও জাগতিক সমস্ত দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করতে।
পশ্চিম বাতাসের ছোঁয়ায় তিনি যেন ভুলে যান অতীতের সব কষ্ট আর নতুন উদ্যমে জীবনকে চেনেন এই ভেবে যে, শীত আসলে বসন্ত কত ই বা দূর (If Winter Comes Can Spring be far behind?)। তিনি এই প্রাকৃতিক উপাদানকে বলেন তার বৈশিষ্ট্য তাকে দিতে যেন তার লেখা দিয়ে তিনি সারা পৃথিবীতে শান্তির আর সাহসের বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারেন।
কবিতাটির অসম্ভব সুন্দর বৈশিষ্ট্য হলো পশ্চিমা বাতাস কি কি পরিবর্তন আনে কিভাবে পরিবর্তন আনে তার বিশদ বিবরণ। তার একটি হলো এই বাতাস যখন ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বইতে শুরু করে গাছের সব পুরোনো পাতা ঝরতে শুরু করে। কবি বলেছেন, পাতাগুলো এখন রুগ্ন। তারা হয়ে পড়েছে হলুদ, কালো, মরচে লাল, ধূসর । পশ্চিমের বাতাস তাদের উড়িয়ে বেড়ায় আর তার সাথে ফল ফুলের বীজগুলোকেও, পাতা পচে মরে যায় কিন্তু বীজগুলো ঘুমিয়ে পড়ে মাটিতে যতক্ষণ না বসন্ত আসে, তাদের কাঁপিয়ে জাগিয়ে দেয়া বসন্ত…
পুরো বর্ণনা আমাদের সামনে তুলে ধরে ঋতু পরিবর্তনের খেলা: এক ঋতু চলে গেলে আরেক ঋতু আসে, হেমন্তের পর শীত তারপর বসন্ত … প্রকৃতি ধূসর মৃত হতে জেগে উঠে নতুন রুপে নতুন ফল ফসল নিয়ে।
বৈশাখ এলেই এই কবিতা আমার মনে পড়ে যায়। আমি ভাবতে থাকি বাংলাদেশের ঋতু পরিবর্তনের খেলায় বসন্তের বৈশাখে কি কি পরিবর্তন আসে! আমের মুকুল বড় হতে থাকে, কাঁঠালের গায়ে কাঁটা বড় হতে থাকে…এদিকে ফসল তোলা হয়ে গেছে। কৃষকের মনে আনন্দ। খাজনা আদায়ের পরো গোলা ভরে যাবে ধানে । সামনের কয়েকটা মাস আর চিন্তা নেই। তখনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়নি তখনো নিষ্ঠুর জমিদারের হাতে বন্দী হয়নি আয়ের এবং আনন্দের উৎস “ফসল”।

তাইতো বাঙালি মুসলমানের ঘরে ঘরে আনন্দের বন্যা বয়ে যেতো। কৃষকেরা কৃষাণির মায়ার হাতে তৈরি করা পান্তা ইলিশ ভর্তা দিয়ে এবং পিঠা পুলি খেয়ে খাজনা দিতে যেত আর মেতে উঠতো নানারকম মেলায় খেলায়: নৌকা বাইচ, দাড়িয়াবান্ধা, কুস্তি প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। এই উপলক্ষে বসতো মেলা: ঘরের যাবতীয় সব তৈজসপত্র আর বাহারী কসমেটিকস আর সাজসজ্জার উপকরণে। আসতো নাগরদোলা আরো কত কি!
এসব উদযাপনে তো এই মাসকে পূজা, প্রকৃতি পূজা, ধারণার পূজা, বিরোধী পক্ষকে অপরায়ণ এসব ছিলোনা। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে শীত গিয়ে বসন্ত গিয়ে নতুন ফল ফসলের গোলা ভরার যে বার্তা আজকের ব্যবসা বাণিজ্য চাকরিতে ব্যাংক ব্যালেন্সের মতো। খাজনা প্রদান আজকের ট্যাক্স দেয়ার মতোন। কে না খুশী হয় আয় ব্যয়ের সামঞ্জস্যে এবং দিন শেষে তার সঞ্চয়ে লাভে মুনাফায়? আর এই প্রাপ্তি পরিশ্রমী কৃষক কৃষাণি জীবনের অনিবার্য অনুসঙ্গ ছিল বলেই বৈশাখের দিনগুলো তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সময়ের বিবর্তনে যারা একে বিশেষ ধর্মের এবং বিশেষ রাজনীতির রুপ দিয়েছে এবং যারা একে ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কারণে প্রত্যাখ্যান করেছে দুটো অংশ ই প্রান্তিক। প্রথম গোষ্ঠী হলো আদর্শের দিক দিয়ে চরমপন্থী, প্রোপাগান্ডামুখী এবং ইসলামোফোবিক। এরা সংস্কৃতির সব উপাদানকে তাদের রাজনৈতিক রঙ দেয় এবং হাতিয়ার বানায়। এই কাজটি করতে গিয়ে সাংস্কৃতিক অথেনটিসিটি কিংবা ডাইভার্সিটি চাপা দিয়ে মারে। বাংলাদেশের সংস্কৃতির মার্জিত উপাদানগুলোকে হাইজ্যাক করে। করেছে।
অন্যদিকে বৈশাখ-পরিত্যক্ত অংশ ধর্ম এবং সংস্কৃতির যোগাযোগ অস্বীকার করে এবং এই দুটোর কথোপকথন কেমনে হয়, কেমনে মানুষের সুকুমার বৃত্তির চর্চা করতে হয়, কেমনে ধর্ম আর জীবন যাপন পারমিউটেশন কম্বিনেশন করতে হয় এরা এসব নিয়ে ভাবতে চায় না। ভাবে না। জীবন ধর্ম মানুষ সমাজ সংস্কৃতি চারপাশ এদের কাছে কিছু রিচুয়্যালে বাঁধা। এর বাইরে সব “নিষেধ”, সব “হারাম।”
হ্যাঁ বৈশাখের আধুনিক শহুরে এলিটশ্রেণীর ক্যাপাটালিষ্ট এবং কনজিউমারিষ্ট কালচারাল দিক সমালোচনার যোগ্য। আচ্ছা বৈশাখ এলেই আপনাকে কেন নতুন শাড়ি পাঞ্জাবি কিনতে হবে? কেন শাদা লাল ই পড়তে হবে? কেন ইলিশ ভর্তা পান্তা খেতে হবে? কেন সব জিনিস চড়া দামে বিক্রি হবে? এই বাজার বাজেট কাদের সৃষ্টি এ নিয়ে আলাপ যৌক্তিক । কিন্তু ঋতু পরিবর্তনের যে এপিল গ্রামীণ জীবনের যে ইতিহাস ঐতিহ্য নষ্টালজিয়া তাতো এসব ফলস ফিলোসফির এবং তার প্র্যাকটিসের জন্য মিথ্যা হয়ে যেতে পারে না!
এই ইতিহাস ঐতিহ্য নষ্টালজিয়ার চর্চাই আমাকে আকৃষ্ট করে। আমি খুঁজি এর থেকে আমাদের আত্মপরিচয়ের কি বার্তা আছে । খাওয়া দাওয়া পোশাক আশাক গাল গল্পের চকচকে অন্তঃসারশূন্য খোলসের আড়ালে “সত্যিকারের বৈশাখ” খুঁজতে থাকি। এমন বৈশাখ যেখানে আমার পূর্ব পুরুষদের গন্ধ। এমন বৈশাখ যেখানে আমার শিকড়ের চাষবাস। এই চাষবাস একদিনের নয়। একদিনের জন্য নয়।
এটা বোঝার জন্য যে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদেরো ইতিহাসের পুনঃপাঠ এবং সেই সাথে পজিটিভ পরিবর্তনের সুযোগ আছে। বৈশাখীর উষ্ণ বাতাসে দানবীয় শক্তিকে উড়িয়ে দেয়ার মতো উপমার দরকার আছে। রক্তাক্ত অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভালোর পথে গঠনের পথে এগিয়ে যাবার শিক্ষা নেয়ার দরকার আছে।
আর কতকাল বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলবে? কতকাল আমরা শুধু একটা বন্যা আর জলোচ্ছ্বাসের দেশ হয়ে থাকবো? আর কতকাল আমাদের সম্পদ লুট হবে?
আমাদের ফল ফসলের দিন আসুক, আমাদের লুট হয়ে যাওয়া গোলাগুলো আবার সম্পদে ভরে যাক। ঘরে বাইরের সব বর্গী নিপাত যাক। বৈশাখ হয়ে উঠুক সত্যিকারের অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সামাজিক যোগাযোগ, এবং শান্তি স্বাধীনতার প্রতীক।
উম্মে সালমা, ১ এপ্রিল ২০২৪.

