
পরিচিত শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু বান্ধবরা যখন সেমিষ্টারের শুরু মাঝখান এবং শেষে ছুটি পেলেই দেশের দিকে ছুটে যায়, আমি বসে বসে ভাবি, আহারে কি আনন্দ আকাশে বাতাসে! সেই সাথে নিজেকে জিজ্ঞেস করি, ইস, আমি পারিনা কেন? বেশ হতো যদি এরকম হুটহাট দেশ থেকে বেড়িয়ে আসা যেতো!
আসলেই বেশ হতো! কিন্তু সাধ আর সাধ্যের মধ্যে যে অনৈক্য তা কি আর বলতে! এই সাধ্য দায়িত্বের এবং অর্থনৈতিক। একসময় বাচ্চারা ছোট ছিল। পড়ালেখার চাপ বা প্রয়োজন অতটা ছিল না। যখন তখন হুটহাট করে ওদেরকে প্যাক করে বেরিয়ে পড়া। প্রথম প্রথম অষ্ট্রেলিয়া এসে এত ঘুরেছি আলহামদুলিল্লাহ।
অথচ এখন একপা দেয়ার আগে ওদের সাথে কথা বলতে হয়। চোখ রাখতে হয় ওদের কখন এসেসম্যান্ট কখন স্কুলে কি ব্যস্ততা!আর স্কুলের বাইরে যেহেতু এখানে বাচচাদের ফ্রেন্ডগ্রুপ নেই বললেই চলে, ওদের সব আনন্দ নিরানন্দ পড়াশোনা খেলাধুলা সব কিছু স্কুল কেন্দ্রিক। আর এখানে সিস্টেমটা এমন একটি টার্ম শুরু হলেই একটার পর একটা এসেসম্যান্ট এবং এক্সাম চলতে থাকে… ওদের এদিক ওদিক মাথা দেয়ার সময় ই হয়না! তাই ইচ্ছে করলেই বেরিয়ে পড়তে পারিনা।
তার মাঝে খরচের হিসাবো করতে হয়। দেশে যাওয়া হুট করে? মোটা অংকের টিকিটের দাম। আপনি সারা বছর অল্প অল্প করে মেপে মেপে চলে কিছু সঞ্চয় করেছেন, একবার দেশে যাওয়া মানে ঘ্যাচ! ঘ্যাচ ঘ্যাচ! দেশে গেলে হিসেবের কোন আগামাথা খুঁজে পাইনা। কোথা থেকে এত খরচ আসে জলের মতো ডলার টাকা হয়ে বেরিয়ে যায়…২০২২ এ মনে পড়ে দেশে গিয়ে আমার জমানো ডলার পাউন্ড সব খরচ করে ইসলামী ব্যাংকের জমানো টাকা খরচ করে শেষে লোন পর্যন্ত করতে হয়েছে…
প্রবাসী (নিম্ন?) মধ্যবিত্তের জীবন আসলেই বেশ ঝক্কির। শুধু হিসাব নিকাশ শুধু প্লানিং শুধু ম্যানেজমেন্ট…
এসব দেখে দেখে মাঝে মাঝে দেশের জীবন নিয়ে ভাবি। আচ্ছা, দেশে থাকতে কি জীবন অন্যরকম ছিল? দেশের উচ্চশ্রেণীর চাকরি (বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা) করা মধ্যবিত্তের মতোই কি ছিলাম না? ভালো বেতন ভালো বাসা ভালো খোরপোষ সামাজিক অবস্থান সবকিছু ছিল কিন্তু কোন দিক দিয়ে টাকা আসতো আর কোনদিক দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ আত্মীয় পরিজন নিয়ে বাস করতে গিয়ে চলে যেতো মনে হয় হাতড়ে বেড়াতাম। সাঁতরে বেড়াতাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুবাদে কখনো কখনো আমাদের হাজবেন্ড ওয়াইফের মন উড়ু উড়ু করতো–ইস, যদি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে পারতাম। একটি পিএইচডি! না হয় একটি মাস্টার্স! উন্নত দেশে। একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
যখন দেখলাম, আরিব্বাস, এ আরেক কঠিন সংগ্রামের নাম, আমার মনে আছে, আমি ভাবতাম, থাক, ও পথে না গিয়ে, ঘরের কাছে মালয়েশিয়ায় একটি মাস্টার্স করি। হিসেব করে দেখলাম, তাও বেশ কিছু টাকা যে টাকা আমাদের কাছে নেই! এখনো মনে আছে একদিন এ নিয়ে আমাদের মধ্যে কি কথা কাটাকাটি রাগারাগী! আমি তাকে বলছি, টাকা জোগাড় করতে! সে বলছে, কোত্থেকে? সে পারবে না। ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন
মনে হলো, এই এক জিনিস…এই টাকার জন্য জীবনে অনেক ভালো ভালো স্বপ্ন বোধহয় অধরা রয়ে যাবে!
এইসব কিছু নিয়ে যখন একসাথে করে জীবন নিয়ে ভাবি, তখন বুঝতে পারি আল্লাহ এভাবেই বিশ্বাসীদের জীবন টানাপোড়েন কষ্ট ক্লেশ পাওয়া না পাওয়া দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। কোন কিছু চাইতে গেলে যে এই যে হাজারো হিসেবে নিকাশ হাজারো বাঁধা হাজারো প্লানিং এবং ম্যানেজমেন্ট এটাই আল্লাহর তরফ থেকে তার বান্দার প্রতি রহমত দয়া আর জীবনের পরিকল্পনা। আল্লাহ চান এই ঝক্কির মাঝে যেন আমি আমরা তাকে ইকুয়েশনে নিয়ে আসি: তার কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি দোয়া করি তার কাছে সামর্থ্য চাই তার কাছে শক্তি চাই। জীবনে কিছু পাই বা না পাই জীবনের ইকুয়েশনে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে ইনক্লুড করতে পারাটাই সফলতা।
কতটুকু তাকে জীবনে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছি জানিনা, তবে শত শত শত সমস্যার মাঝে আমি নিজেকে ধনী বলেই মনে করি। হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যার একদিনের খাবার আছে একটা সুস্থ শরীর আছে মাথা গোঁজার মতো ঠাঁই আছে যে একদিন সকালে কোনরকম যন্ত্রণা ছাড়া ঘুম থেকে সহজ স্বাভাবিক ভাবেই জেগে ওঠে দিনের কাজ শুরু করলো, সেই পৃথিবীর রাজা। তার জীবন রাজার মতো।
প্রতিদিন সকালে নিজেকে মনে করিয়ে দেই এই কথাটা। প্রতিদিন নিজেকে বোঝাই চেয়ে পেয়ে যাওয়ার জন্য জীবন না! জীবন পরীক্ষার কষ্টের যন্ত্রণার। নিজেকে বোঝাই, আফসোস করো না। তাকে পরিবর্তন করো শুকরিয়ায়। আলহামদুলিল্লাহ’য়। তাইলে শত শত শত অপূর্ণতার মাঝে তুমি বেঁচে থাকবে শান্তি আর স্বস্তিতে।
উম্মে সালমা, ২৭/০৬/২০২৫, টুঅং

ভালো লিখেছেন
LikeLike
Thanks very much.
LikeLiked by 1 person