Reflections

স্বমন্বয়ক হান্নানের কান্না: কি ভাবছি!

“বাড়ির পাশে আরশিনগর
সেথায় এক পড়শী বসত করে
আমি একদিন ও না দেখিলাম তারে…”

এই গানটি নিয়ে কলেজ জীবনে একসময় তুমুল আলোচনা হয়েছিল কবিতা পড়া এবং কবিতা লেখা বন্ধু মহলে। কিশোরী কাল। নতুন নতুন আধ্যাত্মিকতার সাথে পরিচয়। কেমন কেমন লাগে এইসব গান শুনলে তাদের বুঝতে চেষ্টা করলে। তার মধ্যে কেউ যদি বলে, এই জানিস “আরশিনগর” মানে কি এই গানে ? মানে হলো মন/রিদয়। বল, তোর মন/রিদয় তোর সাথেই তো আছে, তাকে দেখেছিস? কখনো ?

আরশিনগর দেখিনি, সত্যিই দেখিনি, ইমাম গাজ্জালীর মতো কলবের সন্ধান করতে করতে বুঝতে পারিনি রিদয়/কলব/মন হলো দৃশ্যমান হৃৎপিণ্ডের একটি ফাঁকা জায়গা। কিন্তু এতটুকু বুঝতে পারি রিদয় নামক জায়গা হতে উৎসারিত না হলে স্বমন্বয়ক হান্নানের মতো কেউ কাঁদতে পারেনা, কেউ মনের ভেতর গুমরে থাকা ভাষা বাকরুদ্ধ কন্ঠস্বর এবং চোখের জলে এভাবে ঢেলে দিতে পারে না।

ক্লান্ত বিকেলে তার কান্না দেখে আমি না কেঁদে পারিনি।

এতটুকু জীবনে কম দেখলাম না, কৈ কখনো তো কাউকে তো দেশের জন্য এভাবে কাঁদতে দেখিনি?

ওর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা রেজাল্টের অপেক্ষার পর ভালো ক্যারিয়ার ছিল আমার স্বপ্ন। দেশের জন্য মাঠে নামবো রাস্তায় নামবো ধার্মিক ভালো ছাত্রী হয়ে মেয়ে হয়ে (কিংবা ভালো ছাত্র ছেলেটা হয়ে)? অসম্ভব…বাবা মা পরিবার পিটিয়ে আমাকে চেপ্টা করে ফেলতো। কারণ রাজনীতি খারাপ জিনিস। ঘরে বাইরে সবখানে সবসময় একটা highly protected cocoon ছিল। সীমানা দেয়া ছিল। এটা করবে ওটা করবে না। ঐ যে ঐটা তোমার জন্য। এটা পাবার জন্য চেষ্টা কর।

আর এই ২০১৮ এর স্টুডেন্টরা, ২০২৪ এর হান্নানরা বুদ্ধি হবার পর থেকে স্বৈরাচারী শাসনের habitus থেকে এ স্বৈরশাসনতান্ত্রিক আদর্শ উদ্দেশ্য উদাহরণের পুনঃ পুনঃ ব্যবহারের (reiteration) পরো কেমন যেন একটা স্বাধীন স্বচ্ছ পরিস্কার চিন্তা আর আবেগ নিয়ে বেড়ে উঠেছে এবং তার জন্য জীবন বাজি রেখেছে!

সেই তারা যখন হিউমিলিয়েটেড ফিল করে, তাদের অশ্রু সত্যি বহন করতে পারিনা!

হান্নানের কান্না আর কথা আমি শুনছিলাম আর শুনছিলাম। সাহিত্য পড়তে পড়তে বিশ্লেষণ করার যে চোখ সেটা মাথায় খেলা করছিলো। মিলান কুন্ডেরার The Unbearable Lightness of Being এ একটি কনসেপ্ট শিখেছিলাম, kitsch (কিছ)। একটু অদ্ভুত কিন্তু মজার।

এর অর্থ হলো “art, objects, or design considered to be in poor taste because of excessive garishness or sentimentality, but sometimes appreciated in an ironic or knowing way.” (source: Google)

যখন কোন চিত্র ছবি বস্তু অতিরিক্ত আবেগ, সেন্টিমেন্ট, এবং শোঅফ দেখানোর কারণে খুব বাজে রুচির পরিচয় দেয় তাকে বলে, “Kitsch” ( কিছ্)। মানুষ মুখে মুখে প্রশংসা করে এইসব কিন্তু জানে এটা ফেইক। এটা নিম্ন রুচির কাজ।

একটি উদাহরণ দেয়া যাক। যেমন ধরুন, একজন পলিটিশিয়ান গরীব বাচ্চাদের কিছু দান করছে এবং সাংবাদিকদের সব ক্যামেরা তার দিকে তাক করা। তখন সেই পলিটিশিয়ান এমনভাবে মানবহিতৈষী চেহারা করলেন এবং আবেগঘন কণ্ঠে কথা বলতে লাগলেন যা তার স্বভাবসুলভ না। তিনি এটা করছেন কারণ তিনি জানেন এটা নিউজ হবে। মানুষের কাছে তার একটি ভালো ইমেজ তৈরি হবে।

মিলান কুন্ডেরা এই ধরণের সব কাজ ছবি ইমেজ সবকিছুকে বলেন “kitsch” বা tasteless and vulgar ছবি।

তো হান্নান যখন কথা বলতে বলতে তার কষ্টের আবেগের অভিযোগের পিকে উঠেছিলো, আমি তাকিয়ে ছিলাম। আমি বুঝতে চাইছিলাম ফ্যাসিবাদের জননীর মতো তার কান্না ফেইক কিনা।

কিন্তু না, তার কান্না খুব খুব রিদয়প্রসূত। এখানে কোন অভিনয় নেই কোন রিয়া নেই কোন লোকদেখানো নেই স্বার্থ নেই। এটা কোন “kitsch” নয়, এটা একটি ভয়ংকর সুন্দর পবিত্র সৎ অভিব্যক্তি। ভীষণ ছোঁয়াচে। বাংলাদেশের হাতিয়া উপদ্বীপ হতে উঠে আসা এক বাঙালি মুসলমান তরুণের চাহিদার চিহ্ন।

স্বাধীনতার তিপান্ন বছর পর কলকাতার ভাষায় নয় ঢাকা এলিটদের ভাষায় নয় দেশভাগের পর আসা মাইগ্রেন্টদের ভাষায় নয়, তাদের পোশাক আশাকে নয়, ফিটফাট ফুলবাবু হয়ে নয়, আঞ্চলিক আর শুদ্ধের দ্যোতনায় গড়া একদম ক্যাজুয়াল দেশীয় পোশাকে এক ছেলে বলে যাচ্ছে তাদের অপমানের কথা তাদের স্বপ্নের কথা স্বপ্ন ভাঙার আওয়াজের আয়োজনের কথা।

প্রবাসী আমি, প্রভিলিজড আমি, না কেঁদে পারিনি। আমার বিশ্বাস এদের কথা যারা বুঝতে চাইবে না, ওদের ভয়েসকে দাবিয়ে দেবে, এদের অপমান করবে, এদের স্বপ্নের সাথে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে, এই অমিত সম্ভাবনাকে ঈর্ষা করবে, তাদের উপর প্রাকৃতিক প্রতিশোধ নেমে আসবে। আসবেই।

উম্মে সালমা
৮/১১/২০২৪

Salma's Poems

যুদ্ধ শেষ হলে সবাই বাড়ি ফিরতে পারে না


যুদ্ধ শেষ হলে সবাই বাড়ি ফিরতে পারে না
যুদ্ধ শেষ হলে একটা লাগেজ গুছিয়ে একদিন সকালে বলা যায় না, আমি আসছি।
যাপন করে আসা জীবন প্লাষ্টিকের গ্লাসের মতো বিনে ফেলে দেয়া যায় না
অনলাইন খুঁজে খুঁজে সবচেয়ে সস্তা টিকিট কিনে
বিমানের ফ্লাইট ধরার জন্য
উবার কল করা যায় না
মেয়েকে বলা যায় না তুই থাক আমি যাচ্ছি
সঙ্গীকে বোঝানো যায় না দেশ আমায় ডাকছে
লাইভে হাসতে হাসতে বলা যায় না
ভ্রাতা ভগিণীগণ মহোদয় মহোদয়া
দেশের মাটিতে দেখা হচ্ছে খুব শিগগিরই

যুদ্ধ শেষ হলে সব যোদ্ধা ঘরে ফিরতে পারে না
সব যোদ্ধা  লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে বলতে পারে না
যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত আমি
বলতে পারে না টিউব ওয়েলের  ঠান্ডা এক কোট্টা পানি খাব দেশে গিয়ে
বলতে পারা যায় না
ভাইগণ বন্ধুগণ, আমি অধিকারের ফেরী ওয়ালা
আপনাদের কাছে বেচবো ন্যায়ের গান
দেশমাতৃকার উনুনে রাঁধা হবে যে এক ঢেগ ভাত আর ইলিশের দোপেঁয়াজা
সেটা আমরা ভায়ে ভায়ে বোনে বোনে ভাগ করে খাবো

যুদ্ধ যখন শুরু হলো
যখন স্বৈরাচার দুরারোগ্য ব্যাধির মতো
ছড়িয়ে পড়েছিল বডিপলিটিকে
মা বলেছিলো
দেখিস একদিন এই ব্যাধি সেরে যাবে
বাবারা গুম হতে ফিরে আসবে
ভাইয়েরা সল্টেড বিস্কুট হাতে নিয়ে কলিং বেল বাজাবে
স্বামীরা ঘরে ঢুকে ত্রস্ত বিতস্র হয়ে বলে উঠবে
এই বাজারের থলে দাও কতদিন বাজার করিনা
তুই ছুটতে ছুটতে ব্যাংকে যাবি হাত খালি
আমি জায়নামাজ বসে দোয়া করতে করতে বলতে থাকবো
ফাবিআইয়ি আ'লা ই রব্বি কুমা তুকাজ্জিবান...

মা, পাশের বাড়ির কমল কি বাড়ি ফিরতে পেরেছিল? যে যুদ্ধে যেতে যেতে সীমানা পেরিয়ে পরে ডিজিটাল অস্তিত্ব হয়ে গেল
মাথার উপর হুলিয়া নিয়ে প্রতিদিন হাজির হতো মুসাফিরের মতো
প্রতিদিন ভাইয়া সবাইকে চুপ করিয়ে দিতো তার কবিতাময় যুদ্ধ শুনবে বলে?

মাগো, জরিনাপুরের সুমন কি বাড়ি ফিরতে পেরেছিল? ঐ যে সে যে যুদ্ধে গেল বলে
সাদাপোশাকে একদল মানুষ তার বোনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ রিমান্ড চেয়েছিল
তার ঘর তছনছ করে দিয়ে ছিলো

মা ও মা ঐ যে উওর পাড়ার উকিল ছেলেটা
মনে আছে ? সে কি বাড়ি ফিরতে পেরেছিল ?
যুদ্ধে নামবে বলে নিয়ত করাতেই
ওরা ওকে একদিন কোথায় যেন নিয়ে গিয়েছিল আর ওর স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলো
অন্ততপক্ষে আমাকে ওর লাশ দাও। আমি দাফন করি।

যুদ্ধ শেষ হলে সবাই বাড়ি ফিরতে পারে না
সিস্টেম চুরমার করে দিতে পারে না
আমলাতন্ত্র ধোয়া তুলসী পাতা হয় না
সংবিধানের চোখে চোখ রেখে বলা যায় না
তোর সাথে ছাড়াছাড়ি
কাককে বলা যায় না কোকিলের ঘরে ডিম পাড়িস ক্যান
রাঘব বোয়ালদের বলা যায় না তোর হা এত বড় কেন
শিং মাগুর কে বলা যায় না আঙি দিস কেন
ছুরি কে বলা যায় না কাটিস না
আগুন কে বলা যায় না জ্বালাস না
কালো কে বলা যায় না
বহুত হয়েছে বাপ এবার সাদা হ!

যুদ্ধ শেষ হলে বাড়ি ফেরা যায় না
যুদ্ধ শেষ হলে শুধু আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়

উম্মে সালমা
২/১১/২০২৪

Salma's Poems

দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা নেই

দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা নেই
মানুষ কেনো যে এমন হয়
কেন যে এমন
কাছে থাকলে একটুও লাগে না যে মায়া
দূর হলে হৃদয়ে পড়ে থাকে ছায়া
হায় ছায়া!
কিছু যদি দিতে চায় চায়না নিতে
পরেই মনে হয় দিত যদি হৃদয়ের ফিতে
আহা যদি!
এভাবে কেন যে মন মেঘ ভালবাসে
মাটির ঠাণ্ডা নিয়ে খুক খুক কাশে
সৃষ্ট অসুখে।
দাঁত থাকতে আসলেই দাঁতের মর্যাদা নেই
শত ইচ্ছা থাকলেও তা মৃত পড়ে রয়
দ্বিধার বাঁধায় ।

ঊম্মে সালমা

Salma's Poems

সম্পূর্ণ রাজনৈতিক

'আমি তোমাকে ভালোবাসি'--বলেছিলাম
দ্বিধায়, বাঁধায়, প্রকারান্তরে
অনায়াসে, অজান্তে, অনন্যতায়
কতবার? হাজার, লক্ষ.........মিলিয়ন ?
জানিনা
জানিনি
জানতেও চাইনি।

জানতে চাইনি আরও অনেক কিছু।
তোমার অর্থনৈতিক আভিজাত্য, সাংস্কৃতিক স্থানীয়ত্ত এবং
রাজনৈতিক রিশতা।
দাদা বললেন, এই বদ্বীপের শিরায় বয়ে যাওয়া রক্ত-রস তার বিশ্বাসে নিঃশ্বাস,
আর কি?
দাদী বললেন, পাত্র ভালা।
মা কাঁদলেন এখানে-ওখানে,
এবং বাবা সারাদিন ফোনে একে তাকে সংবাদ দিলেন। বিয়ে।
আর আমি...
একটি নিরুদ্দেশ নৌকায় ভেসে যাবার তোড়জোড় করছিলাম।

তারপর
হঠাৎ হলো এক বীভৎস বিস্ফোরণ ।
রঙধনুর মতো,
গায়ে হলুদের শাড়ীটার মতো
বসন্তের মতো
বর্ণিল-চিত্রালী সংসারে হঠাৎ বেজে উঠলো
এক রাজনৈতিক নিনাদ।
সহিংস আহবানে,ভয়াবহ বৈরিতায়, ভাঙচুরের বিনোদনে
ডাক এলো ভাগ করার, ত্যাগ করার
একদেয়ালের মধ্যে থাকা বহুমতের অনেককে।
একসীমানার ভেতর থাকা বহু মাত্রিক ভাবনাকে।

এখন? এখন আমি এখন কি করব?
ওঃ! আমি এখন কাকে ভাগ করব,কাকে ত্যাগ করব?
তোমাকে? যে বলে জয় আর বিজয়ের গল্প।
ও! আমি এখন কাকে বর্জন করব?
তাকে? যে শোনায় বিশাস-কেন্দ্রিক জীবন-মৃত্যুর সুর?
অ! আমি এখন কাকে বিসর্জন দেবো?
ওকে? যে ধারণ করে ফাইভ এপকস অফ হিস্ট্রি,সাম্যবাদ আর বিপ্লবের ধারনা?
আর তা করতে করতে নামবো ফাইবার, সাইবার এবং অন্তর্গত যুদ্ধে !

ওহ!
“বড় কষ্ট ভালবাসায়। ভাল তো কাউকে পরিকল্পনা করে বাসা যায়না।
ভালবাসা হয়ে যায় ঘটে যায়।”
সংসারে আর সহবস্থানে
বিহিসেবী
মমতায় আর সহিষ্ণুতায়
মানুষে-মানুষে।

ঊম্মে সালমা
১৩/০২/২০১৩

Salma's Poems

ফাটল

মরিচিকা সরছে আর সময় উঠেছে সকরুণ হেঁকে 
পদ্মা-যমুনার মত স্রোত দুই, সুশীলা হতে পারিনি কেউ
তাই আজ এক কঠিন আর প্রতিকূল ঢেউ, বিশাল ঢেউ
তাড়িয়ে নিয়ে যাছে আমাদের এক দুর্দশার দিকে।

আমাদের একটা স্বাধীন দেশ, তাকে ভালোবেসে বড়
আমরা পেয়েছিলাম, হারিয়েছিলাম রক্ত-ভাসা সবুজে কত
আত্মত্যাগী, ভয়হীন, সত্যভরা জীবন; আহা, সুগন্ধি ফুল যত
অথচ সে প্রিয়তম দেশ-ঘর আজ ভয়ানক পড়পড়

সুতোর মতো প্রস্ফুটিত একটি রেখা একটি বিভেদ
হয়ে ছিল দেয়ালটায় যেটা চিত্রবিচিত্র ছবিতে ভরা ছিল
আঁকা ছিল দেশ-দশের ভাবনা, কর্ম, ব্যর্থতা, আর সাফল্য
বেড়ে গিয়ে সে হলো বড় ফাটল এক যন্ত্রণাময় ক্লেদ

সেই ক্লেদ আজ তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে তোমাকে-আমাকে
এক দানবীয় উপত্যকার কাছে; ওহ! সেখানটায়, যেখানটায়
নারকীয় ক্ষমতা পশুত্বের পাপ আর উল্লসিত পৈশাচিকতায়
নেচে ফিরে জীবনের প্রতিটি প্রশান্তিময় বাঁকে বাঁকে ।

তাই কি সব মরিচীকা? সব নির্বিকার হৃদয় হয়ে উঠছে?
ঘৃণার নির্মূলের নিন্দিত ভাষা আজ স্নিগ্ধ ঠোঁটে ফুটছে ?

উম্মে সালমা
২০১৩, চবি


[কবিতার রচনাকাল ২০১৩ শাহবাগ আন্দোলনে যখন দেশে একটি বিশ্রী বিভাজনের রাজনীতি শুরু হয়েছিল]

Salma's Poems

বাহির হতে খিল

আমার জগত আমার জগত
আমার জগত নীল
হঠাৎ দেখি আমার ঘরে
বাহির হতে খিল
বাহির হতে খিল দিয়েছে
বাহির হতে তালা
আমার হাতে কলম ছিলো
বুকের মাঝে ডালা।

বুকের মাঝে ডালা-ভরা তারার মত ফুল
চোখের মাঝে চমকে ওঠা হীরক রাজার দুল
হাতের মাঝে একটি কলম কালি ভরা পূর্ণ
ঘরের দুয়ার খোলা ছিল রোদে উঠোন চূর্ণ
ঠোটের উপর কথা ছিলো, ভাষায় ভাষায় ধাক্কা
অন্যায় আর অবিচারে সোজা কথা পাক্কা

আমার জগত আমার জগত
আমার জগত সাদা
হঠাত দেখি আমার ঘর
বাহির হতে বাঁধা।
বাহির হতে খিল দিয়েছে
বাহির হতে বন্ধ
আমার হাতের কলমটিকে
বলল হতে অন্ধ।

বলল হতে অন্ধ আর বলল হতে মূক
নীলগুলো সব গুটিয়ে নিয়ে ছাতাপড়া বুক।
হাতের কলম কেড়ে নিয়ে কালি দিলো লেপটে
ফুল্গুলোকে মাড়িয়ে দিয়ে পথে দিলো সেপটে
ঠোঁটের উপর কথাগুলো, বলল ”শালা ঢোক!
শব্দগুলো হজম কর, পেটে বেজায় ভোখ।”

আমার জগত আমার জগত
আমার জগত নস্যি
আমার স্বদেশ শব্দ ধরে
ছুঁড়ে বিশাল বড়শি।
যারা যারা শব্দ করেন
শব্দে ধরেন নীল
তাকিয়ে দেখুন সবার ঘরে
বাহির হতে খিল।

ঊম্মে সালমা, ৫ জুলাই ২০১৭

লিঙ্কস টু ফলোঃ

https://www.facebook.com/notes/1012808585900545/

Umme Salma·Wednesday, July 5, 2017

Salma's Poems

সার্ভাইভারস গিল্ট ‘২৪

খুব বেশী মেঘ জমে
খুব বেশী কালো
আমি জানি তুমি নেই
একটুও ভালো

আমি জানি তোমরা নেই
একটুও ভালো
বুলেটে বিসর্জন দিয়ে
দু চোখের আলো

বুলেটে বিসর্জন?
শুধু তাই নয়
সারপ্নেলের এ শরীরে
জীবন সংশয়

শত শত মুখ চোখ হাত পেট
মাথার খুলিতে
ক্ষত বিক্ষত এ শরীরগুলো
এ কেমন গুলিতে

অথবা

পড়ে আছো মরে আছো
এমন কোমায়
সভ্যতা নাশকারী জীবন হরণকারী
ভয়ানক বোমায়


আর ওদিকে...

সারাদিন ওরা থাকে
মতের অমিলে
কথার পাহাড় গড়ে
এ ওকে ছিলে

ভালোর চিন্তা নেই
ভালো আছে বলে
নিজেদের হিস্যা ই চায়
রাজ কৌশলে?

সবসময় তাই (আমি এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র)
অপরাধী হয়ে যাই
বেঁচে থাকার কষ্টে
হারাই হারাই

সবসময় তাই
সব সকাল ভাই
সময়ের কাছে
হেরে হেরে যাই

এমন অস্ত্র কেন মানুষ বানালো
এই প্রশ্নের কাছে খেই ই হারাই
এমন অস্ত্র কেন মানুষ চালায়
উত্তরহীন প্রশ্নে শুধু খুব তড়পাই

উম্মে সালমা
২৮/১০/২০২৪


Salma's Poems

বিষন্ন/প্রসন্ন ইতিহাসের পাঠ

অন্যায় অবিচারে যখন দেশ ছেয়ে গেলো
এবং নানা ধরনের জুলুম নির্যাতন যখন হয়ে উঠলো নিত্যদিনের রুচি
ঠিক তখনই “কি পাবো কাল?” সেই কথা বিবেচনা না করে তরতাজা যুবকেরা এক সতীর্থ কুকুর নিয়ে জনপদ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন
যেতে যেতে আশ্রয় নিয়েছিলেন দুর্গম গুহায়
সূর্য যার দরোজা কখনো স্পর্শ করেনি
উদয়ের সময় সে হেলে যেতো ডানে
অস্তের সময় বামে
এক সুদীর্ঘ ঘুম তাদের আচ্ছন্ন করে রাখলো শত শত বছর…

এইরকম গল্পের প্রহর ছিলো সেদিন মনে আছে? নীলা?
মনে আছে গভীর শীতে জড়ানো শাল
এক প্রস্থ নীলাকাশ অনেকগুলো বেঞ্চ টেবিল
আর দেয়াল জুড়ে সাদা বোর্ড কয়েকটি সুগন্ধি মার্কার

আমার হৃদয় ছিলো উদ্বেলিত
চোখে অশ্রু
একটা কি এক অদ্ভুত আত্মিক শক্তির উদ্দীপনায়
আমি আমরা হয়ে উঠেছিলাম একটা পরশ পাথর।

কিন্তু…

একটি ক্ষুধার্ত স্বৈরাচারী বাঘ এসে আমাদের সেসব দিন কেমন করে যেন অচিরেই খেয়ে নিল
স্লাইমের মতো একটু একটু করে অন্যায় অবিচার করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা দুর্নিবার লোভ আমাদের হৃদয় ছেয়ে নিলো
আমরা ভুলে গেলাম
অন্যায়ের দিন গুহাবাসী হতে হয়
পালিয়ে যেতে হয় জনপদ হতে
বেছে নিতে হয় কৃচ্ছতা সাধন আর জৌলুসহীন পৃথিবী

নীলা চোখ মোছ প্লীজ
রঙবদলের খেলায় বার বার রঙিন হয়ে ওঠা
সেই শহরটার জন্য
সেই জনপদে লোভ হিংসা আর দুর্নীতিভরা ছায়াদের জন্য কেঁদো না।

আজ বড্ড কঠিন সময়।

আজ অনেক ভালো বাবারা শত শত ছাত্র-জনতার খুনী
আজ অনেক ভালো ভাইয়েরা লুটেরা আর অসৎ
আজ অনেক ভালো শিক্ষকেরা দখলদারদের দোসর
আজ অনেক ভালো নেতাদের হাতে সম্পদের পাহাড়
আজ অনেক ভালো সৈনিকের হাতে আয়না ঘরের চাবি

এইসব ভালো দিয়ে তুমি কি করবে
যার জায়গা শুধুই তোমার জন্য
এই সব ভালো দিয়ে তুমি কি করবে
যেই ভালো শুধু আমি আমি আর আমিময়?
এই সব ভালো দিয়ে তুমি কি করবে
যেখানে অন্যের মাংস খেয়ে প্রতিদিন বেড়ে ওঠে একদল মুনাফিক
খাবলে খুলবে খায় প্রতিদিনের স্বস্তি?

চেয়ে দেখো নীলা
আকাশটা আজ বড্ড রঙধনুময়
কয়েকটি পাখি খেলা করছে লালঝুটিওয়ালা মোরগের মাথায়
সমুদ্রের ঢেউ একটার পর একটা না-বিভাজনের
আলাপ তুলছে
মোবাইলে ভেসে উঠছে লাইকের নোটিফিকেশন

জীবন সুন্দর
সুন্দর রাঢ় থেকে বাংলা থেকে চীন থেকে ফিলিস্তিন
সুন্দর হিউয়েন সাঙের মতো পৃথিবী পাঠ
আর যেতে যেতে দেখা
সময়ে সময়ে মানুষের ন্যায়বোধের চর্চা
এমন ন্যায় বোধ
যেখানে ন্যায় মানেই আমি তুমি সে, আমরা সবাই…

আমরাময়তা উইদাউট দি আদার।

উম্মে সালমা
২২/১০/২০২৪, টুঅং

Reflections

সত্য বলার সাহসকে সাধুবাদ

প্রিয় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ,

গতকাল আপনার দ্রব্যমূল্য বিষয়ক সাহসী বক্তব্য শুনলাম। শুনে মনে হলো একটি নতুন সংগীত শুনছি, এমন একটি সংগীত যা বাংলাদেশের একজন শিল্পী এখনি লিখেছেন এবং এখনি সুর দিয়েছেন। মনে হলো এই এতটুকু জীবনে এমন সংগীত বাংলাদেশের কোন শাসকের প্রতিনিধিদের মুখে শুনিনি। মনে হলো একটি নতুন সূর্য উঠছে একটি নীল দিগন্তে, চারপাশ ঘিরে থাকা শত সহস্র বছরের দুঃসহ অন্ধকারকে পরাজিত করতে করতে…

এই যে সাহসী হয়ে বলা প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাব, এই যে পরিস্কার করে বলা অলস চাটুকারিতা আগের সময়ের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়ে উঠা এবং সেই সাথে ওয়ারণিং দেয়া যে আমরা সিন্ডিকেট ভেঙে দেবো বিশ্বাস করুন ভাই এখানে আমি এই ধরণের কথা আমার এই জীবনে দেশের মাটিতে কাউকে বলতে শুনিনি । আর এখানে আমি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখতে পাই। আমি যেন শুনতে পাই যুগের শার্দুলের কন্ঠ যারা যুগে যুগে দুঃশাসনের স্থানে সুশাসনের জন্য লড়াই করেছে। আমার মন আনন্দে নেচে ওঠে যেন আপনারা এক এক জন বখতিয়ার ঘোড়ায় চড়ে আসছেন দুঃখভরা বাংলার আজীবন সংগ্রামরত মানুষকে শান্তির বাণী শোনাতে। এই সময়ে এই একবিংশ শতকে।

আমি দূর প্রবাসী একজন ক্ষুদ্র শিক্ষক এবং গবেষক। আমি রাজনীতি বুঝি না। রাজনীতি করি না। কিন্তু আমার পরিবার আমার আত্মীয় স্বজন আমার দেশের সাধারণ মানুষেরা যখন বাজারের উত্তাপে জ্বলে পুড়ে মরে এবং বার বার আয় আর ব্যয়ের হিসাব মিলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে থাকে আমার খুব কষ্ট হয়। আমি যখন দেখি এখানে এই বিদেশে একজন সাধারণ মানুষ পর্যন্ত একটা আয় আর ব্যয়ের সামঞ্জস্যতা নিয়ে জীবন যাপন করে, যখন দেখি এখানকার সরকারের মানুষেরা জনগণের জীবন যাপন সহজ করতে প্রতিনিয়ত চেষ্টা সাধনা করতে থাকে, আমার নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। মনে হয় কেন আমার জন্মভূমিতে এরকম শাসক আসে না? কেন শাসক হওয়া মানে “বিকামিং এলিট” এবং তারপর “রুল অফ এলিট”? একপক্ষ ধুঁকে ধুঁকে মরে আর আরেক পক্ষ ঝলমলে আলো ছায়ায় অর্থ সম্পদের পাহাড়ে ফূর্তিতে লিপ্ত থাকে?

এত সবের মাঝে একদল প্রজ্ঞাবান তরুণদের সংগ্রাম করে উঠে আসা জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে, আমি মেসমেরাইজড হয়ে যাই।‌ কিভাবে সম্ভব? এত সবের মাঝে একদল চিন্তক তরুণদের ইতিহাসের ইনসাইটফুল ইনক্লুসিভ পুনঃপাঠ আমাকে অভিভূত করে।‌ এত সবের মাঝে পুরোনো অন্যায় অভ্যাস আর অভিপ্রায়ের ধারা ভেঙে দিয়ে আপনাদের মতো একদল তরুণের অসম্ভব সাহসী উচ্চারণ” আমরা ভেঙে দেবো” শুনে আমি কুল কিনারা পাই না। কিভাবে সম্ভব?

এইতো সেদিন ও মনে হতো এভাবেই জীবন যাবে। দেশের কোন ভবিষ্যত নেই । মনে হতো নিজের সন্তান্দের একটি সুন্দর দেশের গল্প বলতে পারবো না। এভাবেই রুটলেস হয়ে বিদেশে আমাদের বাচ্চারা মানুষ হবে আর দেশকে একটা সাময়িক বেড়ানোর জায়গা ছাড়া কিছু ভাবতে পারবেনা।

ঠিক সেই সময়ে…আপনারা দেশ, ইতিহাস, শাসন নিয়ে এমন কিছু কথা বলছেন…স্বৈরাচারের বয়ান ভেঙ্গে দিচ্ছেন আমরা সত্যই অবাক হয়ে পড়ছি। যে কথা আমরা বুকের মধ্যে নিয়ে ঘুরছি বলতে পারি নি, যে কথা কিভাবে বলবো যেটা বুঝতে আমাকে গবেষণার একটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে, সে কথা আমাদের ছোট ছোট ভাইয়েরা আমাদের পর পর এসে বলে দিচ্ছে এবং সে সব কথা বাস্তবায়ন করবে বলে সাহসী বক্তব্য দিচ্ছে, এটা দেখে সত্যি সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কাছে মাথানত হয়ে আসে। ইতিহাসের যতটুকু পাঠ আছে মানব সভ্যতার ইতিহাসে যখনি জুলুম নির্যাতন অন্যায় বেড়ে গেছে যখনি মজলুমের যন্ত্রণা কান্না রক্ত মৃত্যু অসহনীয় হয়েছে তখনই আল্লাহ এমন একদল লোককে তার জমিনে পাঠান এই জমিনকে বিপর্যয় হতে রক্ষা করতে। এটাই আল্লাহর নিয়ম। তিনি মানুষকে একেবারেই ছেড়ে দেন না।

আপনারা কতটুকু সফল শেষ পর্যন্ত হবেন জানি না, তবে আমি বিশ্বাস করি এবং বিশ্বাস করতে চাই আপনারা সেই সাহসী একদল যারা অন্যায়কে রুখে দিয়ে এর বিস্তৃত ডালপালাকে কেটে ফেলার হিম্মত রাখেন। আপনারা ইতিহাসের সঠিক দিকে আছেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে তাদের জীবন স্বস্তির ছায়া নামানোর সাহস রাখেন।‌ আর এইটা যখন ভাবছি এখন এইসব বলছি এর মানে এই না যে আমি চাটুকারিতা করছি কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার জন্য। এই জীবনে কোনদিন কাউকে তেল দিয়ে এই পর্যন্ত আসিনি এবং সামনে ও কোনদিন যাবো না তেল দিয়ে কিছু পাবার জন্য। (মেধা আর মাথা উঁচু করে যে জীবন দাঁড়িয়েছে সে কবর পর্যন্ত আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নত হবে না।)

কেন লিখছি তবে? লিখছি যেন এই দিনগুলো লেখার মাধ্যমে থেকে যায়। যেন পরবর্তী সময়ে পরবর্তী প্রজন্ম জানে কি করে ২০২৪ জুলাই বিপ্লব মানুষের মনে আশা আর স্বপ্ন জাগিয়েছিল। কিভাবে কিছু তরুন তরুনী দেখিয়ে দিয়েছিল, “এখন যৌবন যার যুদ্ধ করার তার শ্রেষ্ঠ সময়” । কিভাবে প্রবাসী নারীরা যারা নিজেদের জীবনে বেঁচে থাকার সব উপকরণ থাকার পরও দেশের জন্য ভাবতো এবং ভালো কাজের পৃষ্ঠপোষকতা করতো তাদের লেখণী দিয়ে।

আপনাদের হাত ধরে এই মাইনাস প্রান্তের দেশটি একটু একটু করে উঠে আসুক। স্বপ্ন সত্যি হোক। সাধারণ মানুষ ভালো থাকতে শুরু করুক। আজকে খুব মনে পড়ছে আমার এক বড়বোন সহ শেখা একটি কবিতার কিছু লাইন…

“পাথরে পারদ জ্বলে
জলে ভাঙে ঢেউ
ভাঙতে ভাঙতে জানি
গড়ে যাবে কেউ
তন্দ্রার আচ্ছাদন ছেঁড়ে এসো আমরা জেগে উঠি
এসো আমরা গড়ে তুলি আরেক পৃথিবী
গড়ে তুলি প্রজন্মের সাহসী তুফান…”

উম্মে সালমা , ২০/১০/২০২৪, টুঅং






		
Reflections

আফটার আগস্ট ৫ঃ আবেগ ও নৈতিকতার দোলাচল ? একটি রিফ্লেক্সসন

আগস্ট ৫। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি নতুন দিন। একটি নতুন ইতিহাস। এই দিনটি ফ্যাসিবাদের পতনের মাধ্যমে নতুন এক স্বপ্নের সুচনা করে, প্রায় দেড় হাজারের বেশী শহীদ এবং ত্রিশ হাজারের ও বেশী মানুষের আহত হবার মাধ্যমে । এটি একটি দারুণ জাগরণ । নানা রকম দুঃশাসনে ১৬ টি বছর জর্জরিত মানুষ এই দিনে সাম্য, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদা নিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে ।

কিন্তু chaos এবং organic প্রসেসের মাধ্যমে আচানক উঠে আসা আন্দোলন কি আচানক সব প্রত্যাশা পুরন করতে পারে? পারবে? এ নিয়ে যখন ভাবি, ফ্রেন্স রেভুলিউশন (French Revolution) এর কথা মনে পড়ে। ফ্রেন্স রেভুলিউশন খুব জটিল এবং বহুমুখী একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল। এর মূলমন্ত্র হিসেবে ছিলো স্বাধীনতা (liberty), সমতা (equality), এবং ভ্রাতৃত্ব (fraternity)। এত সুন্দর মটোগুলো! একসময় খুব অল্প বয়সে যখন এগুলো পড়েছিলাম কি অসাধারণ যে লাগতো! মনে মনে ভাবতাম, আহা! যদি সত্যি এরকম হতো একটি সমাজ! স্বাধীনতা, সমতা, এবং ভ্রাতৃত্ব !

কিন্তু ১৭৮৯ এর পরে ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া নানা অঘটন যেমন নেপোলিয়নের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা, রবেসপিয়ারের এক্সিকিউশন, রেইন অফ টেরর এবং কাউন্টার রেভুলিউশনের সাসপেকট হিসেবে বহু মানুষের শাস্তি, হত্যা, জেল, জুলুম, নারীদের সমতার জন্য লড়াই ইত্যাদি,  যা একের পর এক দানা বেধেছিলো ১৮৩৪ সাল পর্যন্ত, সত্যি ভয়াবহ। এগুলো আমার বুক কাঁপিয়ে দেয়। যত পড়ি, তত দেখি, ইতিহাসবিদরা এই বিপ্লব নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কিছু কমন কথা বলেন যা সারমর্ম হোলো, পরিবর্তনের পজিটিভ উদ্যোগ নেয়া এবং তার বাস্তবায়নের চেয়ে যে কোন মোনারকির বিরোধীতা করা সহজ । গরীবদের প্রতি সহানুভূতি সবার থাকে কিন্তু “existing social system significantly” পরিবর্তন করার ইচ্ছা এবং সক্ষমতা বিপ্লব পরবর্তী প্রভিশানাল সরকারের থাকে না। তারা দেখে যে একটি সাংবিধানিক সংসদ আসা পর্যন্ত তাদের মূল ভূমিকা হলো অর্ডার আর এডমিনিষ্ট্রেশন চালিয়ে রাখা । তারা আর কোনো ভায়লেন্স চান না তাই এক্সিস্টিং “authorities” এবং “bureaucratic system and organisations” টিকিয়ে রাখেন। তো, বিপ্লব পরবর্তী সময় হয়ে ওঠে আরো কেয়টিক।‌

বাংলাদেশে যা ঘটছে প্রতিনিয়ত যা প্রতিনিয়ত আমাদের নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে নতুন নতুন অপোজিশনের জন্ম দিচ্ছে এটা আসলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। যদিও বাংলাদেশে এখন রেইন অফ টেরর জাতীয় কিছু হয়নি বা হবার সম্ভাবনা নেই (পুরাদাগে একটা plurality এবং reconcliation এর আবহের জন্য), যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা হলো, কাউন্টার -বিপ্লবের ক্রম শক্তি প্রদর্শন এবং বিপ্লব বেহাত হবার ভয়। এর পেছনে কাজ করছে একটি বংশগত এবং সামাজিক লতায়-পাতায় জড়ানো সামাজিক সম্পর্ক যা দক্ষিণ এশিয়ায় বিরাজ করে। প্রত্যেক মানুষ প্রত্যেক পরিবার প্রত্যেক সামাজিক লেনদেন ব্যবসা বানিজ্য “inter-political programme” এর সুতোয় বাঁধা।

এই বিষয়টি আমাকে ২০১৩ সালে থেকে ভাবাতো। যখন শাহবাগ আন্দোলন হচ্ছিল এবং পুরো বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হলো বিভক্তির এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি, আমার তখনকার লেখা কবিতায় (“সংসার এবং সহবস্থান” ) এটা নিয়ে একটা আলাপ উঠে এসেছিলো । আমি বুঝতে পারতাম না কিভাবে একটা সমাজে এই জড়াজড়ি (entanglements) খুলে নির্মূলের রাজনীতি করা যাবে?

পুরো ফ্যামিলিতে আমাদের অঙ্গনে আমরা কখনো রাজনীতি দিয়ে বিভাজন দেখিনি। নানাজন নানা দল সাপোর্ট করতো কিন্তু একে অন্যকে শুধু “রাজনীতির চোখ” দিয়ে দেখা এটা ছিলোনা। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে ২০১৩ সালে এটা আমদানী হয় দেশীয় অঙ্গনে আওয়ামী এবং বামধারার রাজনীতির হাত ধরে এবং তার পর তো আমরা সবাই জানি……নোয়াখালীর ভাষায় এদেরকে বলে, “চোখ খাটা তেলী”। আওয়ামী এবং তার দোসররা চোখ খেটে মানে চোখ বন্ধ করে তারা ছাড়া সবাইকে শেষ করার পথে নেমেছিল এবং শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত শেষ করে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল।

এসব বলার মানে এই যে, বিভাজনের রাজনীতি তৈরি করা দল এবং মানুষ গুলো আজ যখন বিপদে, যখন তাদের ব্যক্তিগত এবং আইনগতভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর সময়, তখন কিছু দল এবং মানুষের মাঝে সেই রাজনীতির উর্ধ্বে ওঠার একটা প্রবনতা এবং এবং তার সাথে ন্যায় বিচারের একটা সুত্র তৈরি করার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে । ক্ষমা, রাজনীতির নানা অধিকারের বয়ান, অপরাধ লঘু করে দেখা, কিংবা আওয়ামী সমর্থকদের প্রতি (গোপন?) সমবেদনা ইত্যাদি সেরকম কিছুর বহিঃপ্রকাশ। অনেকে আবার এটা মক্কা বিজয়ের পরবর্তী সাধারণ ক্ষমার বয়ান দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চান। কেউ কেউ আবার “শাস্তি এবং ক্ষমা”র একটি অসম বণ্টনে এক ধরনের বিচারের কথা বলেন।

স্বাভাবিক ভাবেই সেটা বিপ্লবের সেনটিমেন্টে তীব্র আঘাত। কারণ যারা ইচ্ছে করে জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং সেটা জাষ্টিফাইড করে এবং করেই যায় কোন রকম অনুশোচনা এবং তাওবা না করে, তাদের বিচারই ন্যায়বিচার। casualties হয়ে যাবার একটা শঙ্কা এখানে আছে, যেমন থাকে সব বিচারে, কিন্তু তারপরও দুঃসহ দেশ সৃষ্টিকারীদের বিচার আবশ্যক ।

অভ্যুত্থান পরবর্তী এই সময়ে , এই একটু softness, একটু reconciliation একটু বিভাজন মানুষকে confused এবং ambivalent করে তোলে । আশা আনন্দ দুরাশা দুশ্চিন্তা এককথায় একধরনের সার্বক্ষণিক দোলাচলের জন্ম দেয় মানুষের মনোজগতে।‌ মানুষের সামনে আরেকটি পরিবর্তিত পৃথিবী এবং পরিস্থিতিতে আগের নৈতিক ফ্রেমে দেখা পরিস্কার ছবির (যেখানে সত্য/মিথ্যা জালিম/মজলুম বাইনারি একদম ক্লিয়ার ছিলো) মূল্যায়নে একটি ধাঁধা লেগে যায়।‌ প্রতিদিনের নতুন নতুন ইস্যুতে বিপ্লব বিষয়ক আবেগ অনুভূতি ত্যাগ তিতিক্ষার একনিষ্ঠ সমর্থক এবং সহযোগীরা প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির হিসেব কষতে গিয়ে দুলতে থাকে নানাবিধ দোলাচলে। কোনটি সঠিক কোনটি বেঠিক কে ঠিক বলছে কে ভুল বলছে কোনটি উপকারী কোনটি অপকারী এর চিহ্নিত করণ এবং মেজাজ বোঝা অনেক সময় জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।‌ তারা বুঝতে পারে না যে মানুষগুলো দুদিন আগেও বিপ্লবের পক্ষে কাজ করেছে তাদের সম্পর্কে রটে যাওয়া কথাগুলো কতটুকু সত্য ??? যে যায় লঙ্কায় সে ই কি রাবণ হয়ে উঠে ??? নাকি এটা আবার কোন বিশাল ফাটলের লক্ষণ?

একটা কথা নিদারুন সত্য যে সাধারণ মানুষের বিপ্লবে যতৈ অবদান থাকুক, কোন দেশ তো সবাই মিলে শাসন করা যায় না। হাতে গোনা কয়েকজন (always only a few) ক্ষমতা পায় এবং বাকিরা তাদের নিত্যদিন একি রকম জীবন যাপন করতে ঘরে ফিরে যায়। সুতরাং বিপ্লবী-দিনের ইউফোরিয়া কমে আসার বাস্তবতায় “জীবন কতটুকু পরিবর্তন হলো” (“how far our life has changed/ improved”) এই প্রশ্ন বারবার মাঠে ঘাটে অফিসে বাজারে প্রতিনিয়ত মানুষকে ভাবাতে থাকে, কারণ বিপ্লব হয়েছে ঠিকই, কিছু মানুষ পালিয়ে আছে/গেছে, কিন্তু the old structure is still intact, a structure which sheer gathering of a mass cannot dissolve and resolve. It needs a systematic functioning by a group of skilled persons which is rather a slow process and a job, again, of a very “few” in power, law, administration, and bureaucracy. আর এই বুরোক্রাটিক ব্যবস্থা ১৯৪৭ ব্রিটিশরা এবং ১৯৭১ এ পাকিস্তানীরা চলে যাবার পর যে সমস্যা ফেস করেছিলো মোটাদাগে সেটাই ফেস করছে । আন্দোলন পরবর্তী অনেক অনেক গুলো পজিটিভ উদ্যোগ নেয়া হলেও এবং কিছুক্ষেত্রে নতুন নতুন ব্যবস্থা/ রদবদল হলেও বুরোক্রাটিক ব্যবস্থা এবং ওভারোল জাতি এখন ও বিপদ্গ্রস্থ। একসাথে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একমত হয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়া, জীবন যাপনের একটি গুনগত পরিবর্তন এটা এখনও দেখা যাচ্ছে না।

তাই সাধারণ মানুষেরা আন্দোলনের ফসল সহসাই ঘরে তুলতে পারবে না বলেই মনে হচ্ছে।‌ বিভিন্ন স্থানে যখন বিভিন্ন গ্রুপে গ্রুপে “processes of resistance” চলছে, কিন্তু এসবের ভেতরেও সবখানে আশা নিরাশার দোলাচল। এখনো অনেক বিষয়ে বিষয়ের এত এত জটলা আর জটিলতা যে আমাদের মনোজগত একদম টালমাটাল। ফ্যাসিবাদের পতনে আমরা খুশি কিন্তু ফ্যাসিবাদের অবশিষ্ট/রেসিডু কিভাবে মোকাবেলা করে সার্বিকভাবে শান্তিময় দেশ হবে সেটা মনে হচ্ছে যেন ইউটোপিয়া। এই সময়ে তাই Animal Farm আবার যেন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে । আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের Boxer and Clover এর মতো মনে হয়। বার বার আহত হয়েছেন তাদের মানুষগুলোর খবর এবং ছবিগুলো দেখি এবং নিদারুন কস্ট লাগে। সবাই কত বিষয় নিয়ে কাইজ্যা করছে, আর তারা? কষ্টে কষ্টে পারে করছে প্রতিটি মুহূর্ত ! এদের দিকে তাকিয়ে হলেও দেশটাকে কি একটু শান্তি দেয়া যায় না? জুলাই বিপ্লবের/ অভ্যুত্থানের লক্ষ্য সামনে রেখে সব কাজ করা যায় না? এসব ভাবি আর মনে হয়, আমাদের সামনে এখনো বোধয় সীমাহীন পথচলা।

উম্মে সালমা, ১৬/১০/২০২৪