তোমার জন্য আমার ফটো এ্যলবাম আলমারির এক তাকে এবং ফেসবুকের এক কোণে আপলোড করে রেখেছি যদি কখনো সময় হয় একটু ঘুরে এসো আমার শেলফ আমার ওয়াল দেখে এসো তুমি যে বার বার বলো, “না, মনে নেই” “সব ভুলে গেছি” “আমার এত কিছু মনে থাকেনা” সেটা আমার হৃদয়ে কতটুকু রক্তক্ষরণ করে কতটুকু কান্না বিলাসী ভোমরার মতো উড়ে বেড়ায় চোখের অরণ্যে।
মানুষের জীবনে বর্তমান টা আর কতটুকু ই বা স্থায়ী! সকালের স্বাদ কি তরতরিয়ে দুপুরের তিক্ততা বিকেলের ব্যস্ততা আর রাত্তির মৌনতায় ডুবে যায় না? একমুঠো নীলাকাশ কি এক লহমায় একটি রংধনু হয়ে ওঠে না? একটি সুশান্ত সাগর মূহুর্তেই কি অশান্ত হয়ে সব তছনছ করে দেয় না?
তাহলে? তাহলে যা নিয়ে আমরা বাঁচি তা কি বর্তমান? নাকি তার নাম অতীত প্রতিমুহূর্তে যার জন্ম প্রতি মূহুর্তে যার জমা জমায়েত স্মৃতি নামক এক দুঃসহ এ্যলবামে
স্মৃতি: কোথায় থাকে এই এলবাম? কালবে? না মস্তিষ্কে? আবেগে না যুক্তিতে?
স্মৃতি: কোথায় থাকে এই স্টোরেজ? মনে না মননে দৃষ্টিতে না দর্শনে?
আমি বুঝতে পারি না আর এই না বুঝতে বুঝতে আর্তনাদ করি তোমার ভুলে যাওয়ার মতো করে আমি ভুলতে পারিনা কেন? কেন আমার অশরীরের কোন খাঁজে ছোট ছোট ফাইল হয়ে জমে ওঠে দিনযাপনের দিনগুলি
কেন আমি গেয়ে উঠি দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না কিংবা জীবনের সোনাঝরা দিন গুলো হায় শীতের পাতার মতো ঝরে যায় কেন আমি মোবাইলে ফেসবুকে অবিরত খুলতে থাকি স্মৃতির খাতা?
আর এইভাবে কি শিখা যায়? কিভাবে ভুলে গিয়ে ভালো থাকা যায় কিভাবে ভুলে গেলে জীবন স্বাভাবিক লাগে কিভাবে মানুষ বরফের মতো বর্তমানে হেসে খেলে বেঁচে থাকে!
আমরা যারা ৯০ এর বাংলাদেশের আবহে বড় হয়েছি রবীন্দ্রনাথ নজরুল বিভূতিভূষন কিংবা হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ে, আমাদের অনেকের কাছে ভালোবাসাটা আত্মিক উপলব্ধির, গোপন, নীরব, গভীর। এটা এমন এক অনূভুতির যাকে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, স্বার্থপরের মতো দাবী করে করে জানান দিতে হয়না, বরং দ্বায়িত্ব, স্থায়িত্ব, এবং ত্যাগের বিনিময়ে ফুটিয়ে তুলতে হয়।
নজরুলের “ব্যাথার দান” যখন পড়তাম, কি গভীরভাবে আমাদের ভাবিয়ে তুলতো: না পাওয়া ভালোবাসার কষ্টের কথায়। কিংবা হিমু যখন আসবে বলে ও আসতো না, আমরা বুঝতাম, হিমু রুপা কে কি গভীর ভালোবাসে এবং ভাইসভারসা কিন্তু তারা একে অন্যের কাছে আসতে পারে না। কিন্তু তাই বলে ভালোবাসা মিথ্যা হয়ে যায় না। বরং কি এক গভীর অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত ভালোবাসা সম্পর্কগুলো কত সুন্দর! শত না পাওয়ার মাঝে কত টান!
মাঝে মাঝে ভাবি এইসব অতিপ্রাকৃত আয়োজনের মাঝে বেড়ে ওঠাই আমার জন্য কাল হয়েছে। আমার জীবনে বিয়ে সংসারের মাধ্যমে যে নারী পুরুষের স্বাভাবিক আকর্ষনের যাত্রা শুরু হয় তার মধ্যে এইসব কিছুটা ফিলোসফিক্যাল কিছুটা কাব্যময় কিছুটা আত্মিক কিছুটা শব্দহীন ভালোবাসা ঢুকে পড়ে গেছে।
আমি গভীর ভালোবাসতে পারি যে কাউকে কিন্তু যে নদী গভীর বেশি তার বয়ে চলার শব্দ তত কমের মতোই আমার ভালোবাসার প্রকাশ। অতি প্রদর্শনী অতি মুখরতা অতি তরতরানো দেখলে বিরক্ত লাগে এবং লাগতো। এগুলোকে বরাবরই ফেইক মনে হতো। মনে হতো, আরে, যেখানে ভালোবাসা মমতা মায়া আছে সেখানে সম্পর্ক যে কোনো মূল্যে সুন্দর হবেই। আমার সততা আমার বিশ্বস্ততা আমার অনুরাগ আমার আবেগ আমার ভালোবাসার মানুষ এবং মানুষেরা বুঝবেই! আর এইজন্য নিজের ভেতর একটা আত্মসম্মানবোধ সবসময়ই জেগে ছিল। আমি ভাবতাম, ভালোবাসা শ্রদ্ধেয় এবং শ্রদ্ধার। এখানে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকবে এবং তা থাকবে আত্মসম্মানবোধ থেকেই। মর্যাদাবোধ থেকে।
এবং ব্যাপারটা এমনো মনে হতো যে, যে আমার এই দর্শন এই গভীরতা বুঝতে পারবে না, তার আর কি যোগ্যতা ই বা আছে আমার জীবনের অংশ হবার? সে যদি বুঝতে না পারে, তাকে আমি চাই এবং তার প্রতি আমি বিশ্বস্ত, তাহলে সে আর কি বুঝে ? হতে পারে ভাষার প্রকাশ কম, হতে পারে শব্দের কোলাহল নেই: ঠিক নজরুল যেমন বলেছিলো:
যারে চাই তারে কেবলি এড়াই কেবলি দি তারে ফাঁকি সে যদি তুলিয়া আঁখি পানে চায় ফিরাইয়া লই আঁখি
কিন্তু ভালোবাসার এই আত্মসম্মানবোধ নিয়ে আজকাল নতুন করে ভাবতে থাকি। হুড়মুড় করে সোশাল মিডিয়ার আগমন এবং মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের সহজ সুযোগ দেখে মাঝে মাঝে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যাই। আপনি স্যোশাল মিডিয়ায় নীরব, ভাবছেন বেঁচে গেলেন? না একদম না। আপনি আপনার ব্যাক্তিগত জীবন ফেসবুকে হাইলাইট করেন না, আপনি বেঁচে যাবেন? একদমই না।
বাস্তব জীবনে এমন কিছু মানুষ এবং ঘটনার সম্মুখীন হতে পারেন, সেখানে আপনি “অসুখী” ” অযোগ্য” ” ব্যর্থ” হিসেবে বিবেচিত হবেন। আপনার গোপন নীরব গভীর ভালোবাসার ফিলোসফি কে তুড়ি মেরে আপনার সঙী আত্মীয় পরিজন কে বাগিয়ে নেয়ার জন্য অথবা আপনার জীবনে বাগড়া দেয়ার জন্য একদল একদম প্রস্তুত।
ভালোবাসা যেখানে আপনার কাছে আত্মসম্মানবোধ তাদের কাছে ভালোবাসা ভালোলাগা মিথ্যা আত্মসমর্পণ। দু’ একদিনের পরিচয়েই গায়ে পড়া, ইনিয়ে বিনিয়ে মিষ্টি মধুর করে কথা, মিষ্টি নামে ডাকা, ঘন ঘন ফোন করা, মেসেজ পাঠানো, গোপন ব্যক্তিগত সুখ দুঃখের কথা শেয়ার করা…আর এসবের ফাঁকে ফাঁকে আপনি দেখতে পাবেন এরা কেমন করে আপনার জীবনসঙ্গী/পার্টনার/ ভালোবাসার মানুষের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। তখনি আপনি দেখবেন আপনার চেনা মুখ নতুন রঙ নিচ্ছে এবং ভাবছে, “আরে, ওতো কখনো আমার কাছে এত আত্মসমর্পণ করেনি, এমন করে আমার হাতের মুঠোয় আসেনি? এমন করে আমাকে প্রশংসা করেনি? এতো আমার সবকিছু নতুন করে পাওয়া।” তখন সে কিন্তু নিমিষেই ভুলে যেতে পারে আপনার দার্শনিক ভালোবাসা কে।
জানি এসব সব ঠুনকো, লোক দেখানো, শয়তানের ওয়াসওয়াসা এবং শেষ মেষ জঘন্য অপরাধ, তবুও এসব দেখে দেখে নতুন করে ভাবতে থাকি, ভালোবাসা সম্পর্ক মমতা মায়া এসব আসলে কি? এসব কি আত্মসম্মানবোধে মোড়ানো একটি সুন্দরের নাম না লজ্জা শরম বিহীন লোক দেখানো আত্মসমর্পণ? কোনটা আসলে ভালো? ভাষাহীন ভালোবাসা না মোহময় শব্দের বেসাতি? নাকি ভালোবাসার কোন অস্তিত্ব নেই, সব শরীরের খেলা: হরমোনের প্রভাব। মন বলে কিছু নেই। নারীর পুরুষ হলেই হয়, পুরুষের নারী। ব্যাক্তি এখানে তুচ্ছ!
জানি না, জানতে চাই না তবে কেন যেন মনে হয়, যত যাই হোক, দুনিয়ার যত পরিবর্তন আসুক, ভালোবাসার মায়ার মমতার শক্তি আর সততা সাময়িক ভূপাতিত হলেও তার মৃত্যু নেই ক্ষয় নেই পরাজয় নেই। সত্য তো চকচকে হয় না, সত্য হয় দৃঢ় ক্ষয় লয় বিহীন।সৎ মানুষের জীবনের সফলতা ওখানেই।
পরিচিত শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু বান্ধবরা যখন সেমিষ্টারের শুরু মাঝখান এবং শেষে ছুটি পেলেই দেশের দিকে ছুটে যায়, আমি বসে বসে ভাবি, আহারে কি আনন্দ আকাশে বাতাসে! সেই সাথে নিজেকে জিজ্ঞেস করি, ইস, আমি পারিনা কেন? বেশ হতো যদি এরকম হুটহাট দেশ থেকে বেড়িয়ে আসা যেতো!
আসলেই বেশ হতো! কিন্তু সাধ আর সাধ্যের মধ্যে যে অনৈক্য তা কি আর বলতে! এই সাধ্য দায়িত্বের এবং অর্থনৈতিক। একসময় বাচ্চারা ছোট ছিল। পড়ালেখার চাপ বা প্রয়োজন অতটা ছিল না। যখন তখন হুটহাট করে ওদেরকে প্যাক করে বেরিয়ে পড়া। প্রথম প্রথম অষ্ট্রেলিয়া এসে এত ঘুরেছি আলহামদুলিল্লাহ।
অথচ এখন একপা দেয়ার আগে ওদের সাথে কথা বলতে হয়। চোখ রাখতে হয় ওদের কখন এসেসম্যান্ট কখন স্কুলে কি ব্যস্ততা!আর স্কুলের বাইরে যেহেতু এখানে বাচচাদের ফ্রেন্ডগ্রুপ নেই বললেই চলে, ওদের সব আনন্দ নিরানন্দ পড়াশোনা খেলাধুলা সব কিছু স্কুল কেন্দ্রিক। আর এখানে সিস্টেমটা এমন একটি টার্ম শুরু হলেই একটার পর একটা এসেসম্যান্ট এবং এক্সাম চলতে থাকে… ওদের এদিক ওদিক মাথা দেয়ার সময় ই হয়না! তাই ইচ্ছে করলেই বেরিয়ে পড়তে পারিনা। তার মাঝে খরচের হিসাবো করতে হয়। দেশে যাওয়া হুট করে? মোটা অংকের টিকিটের দাম। আপনি সারা বছর অল্প অল্প করে মেপে মেপে চলে কিছু সঞ্চয় করেছেন, একবার দেশে যাওয়া মানে ঘ্যাচ! ঘ্যাচ ঘ্যাচ! দেশে গেলে হিসেবের কোন আগামাথা খুঁজে পাইনা। কোথা থেকে এত খরচ আসে জলের মতো ডলার টাকা হয়ে বেরিয়ে যায়…২০২২ এ মনে পড়ে দেশে গিয়ে আমার জমানো ডলার পাউন্ড সব খরচ করে ইসলামী ব্যাংকের জমানো টাকা খরচ করে শেষে লোন পর্যন্ত করতে হয়েছে…
প্রবাসী (নিম্ন?) মধ্যবিত্তের জীবন আসলেই বেশ ঝক্কির। শুধু হিসাব নিকাশ শুধু প্লানিং শুধু ম্যানেজমেন্ট…
এসব দেখে দেখে মাঝে মাঝে দেশের জীবন নিয়ে ভাবি। আচ্ছা, দেশে থাকতে কি জীবন অন্যরকম ছিল? দেশের উচ্চশ্রেণীর চাকরি (বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা) করা মধ্যবিত্তের মতোই কি ছিলাম না? ভালো বেতন ভালো বাসা ভালো খোরপোষ সামাজিক অবস্থান সবকিছু ছিল কিন্তু কোন দিক দিয়ে টাকা আসতো আর কোনদিক দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ আত্মীয় পরিজন নিয়ে বাস করতে গিয়ে চলে যেতো মনে হয় হাতড়ে বেড়াতাম। সাঁতরে বেড়াতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুবাদে কখনো কখনো আমাদের হাজবেন্ড ওয়াইফের মন উড়ু উড়ু করতো–ইস, যদি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে পারতাম। একটি পিএইচডি! না হয় একটি মাস্টার্স! উন্নত দেশে। একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
যখন দেখলাম, আরিব্বাস, এ আরেক কঠিন সংগ্রামের নাম, আমার মনে আছে, আমি ভাবতাম, থাক, ও পথে না গিয়ে, ঘরের কাছে মালয়েশিয়ায় একটি মাস্টার্স করি। হিসেব করে দেখলাম, তাও বেশ কিছু টাকা যে টাকা আমাদের কাছে নেই! এখনো মনে আছে একদিন এ নিয়ে আমাদের মধ্যে কি কথা কাটাকাটি রাগারাগী! আমি তাকে বলছি, টাকা জোগাড় করতে! সে বলছে, কোত্থেকে? সে পারবে না। ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন মনে হলো, এই এক জিনিস…এই টাকার জন্য জীবনে অনেক ভালো ভালো স্বপ্ন বোধহয় অধরা রয়ে যাবে!
এইসব কিছু নিয়ে যখন একসাথে করে জীবন নিয়ে ভাবি, তখন বুঝতে পারি আল্লাহ এভাবেই বিশ্বাসীদের জীবন টানাপোড়েন কষ্ট ক্লেশ পাওয়া না পাওয়া দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। কোন কিছু চাইতে গেলে যে এই যে হাজারো হিসেবে নিকাশ হাজারো বাঁধা হাজারো প্লানিং এবং ম্যানেজমেন্ট এটাই আল্লাহর তরফ থেকে তার বান্দার প্রতি রহমত দয়া আর জীবনের পরিকল্পনা। আল্লাহ চান এই ঝক্কির মাঝে যেন আমি আমরা তাকে ইকুয়েশনে নিয়ে আসি: তার কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি দোয়া করি তার কাছে সামর্থ্য চাই তার কাছে শক্তি চাই। জীবনে কিছু পাই বা না পাই জীবনের ইকুয়েশনে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে ইনক্লুড করতে পারাটাই সফলতা।
কতটুকু তাকে জীবনে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছি জানিনা, তবে শত শত শত সমস্যার মাঝে আমি নিজেকে ধনী বলেই মনে করি। হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যার একদিনের খাবার আছে একটা সুস্থ শরীর আছে মাথা গোঁজার মতো ঠাঁই আছে যে একদিন সকালে কোনরকম যন্ত্রণা ছাড়া ঘুম থেকে সহজ স্বাভাবিক ভাবেই জেগে ওঠে দিনের কাজ শুরু করলো, সেই পৃথিবীর রাজা। তার জীবন রাজার মতো।
প্রতিদিন সকালে নিজেকে মনে করিয়ে দেই এই কথাটা। প্রতিদিন নিজেকে বোঝাই চেয়ে পেয়ে যাওয়ার জন্য জীবন না! জীবন পরীক্ষার কষ্টের যন্ত্রণার। নিজেকে বোঝাই, আফসোস করো না। তাকে পরিবর্তন করো শুকরিয়ায়। আলহামদুলিল্লাহ’য়। তাইলে শত শত শত অপূর্ণতার মাঝে তুমি বেঁচে থাকবে শান্তি আর স্বস্তিতে।
যেখানেই আপনার আমার মৃত্যু সেখানেই মৃত্যুর দূত আমাদের হাতছানি দিয়ে ডেকে ডেকে নিয়ে যাবে। যেদিন সিদরাতুল মুনতাহা ‘র পাতা ঝরে যাবে তার থেকে গুনে গুনে চল্লিশ দিন তারপর মৃত্যুর পথে পদযাত্রা শুরু। এক ঘন্টা এক মিনিট এক সেকেন্ড এক অনুপল আগানো কিংবা পেছানোর সুযোগ নেই। আপনি সেই নির্দিষ্ট সময়ে যা ই করেন না কেন: ঘুমিয়ে থাকুন, রাস্তায় থাকুন, ঘরে থাকুন, কাজে থাকুন, হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে বক্তৃতা বা গান বা কবিতা গাইতে থাকুন, কিংবা আরো আরো অনেক অনেক কিছু, মৃত্যুর দূত আমাকে আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকলে সেই ডাক উপেক্ষা করার মতো ক্ষমতা আমাদের দেয়া হয়নি। এই সত্য যদি বারবার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা যদি কোন সুপার পাওয়ারের না থাকতো তাহলে কেন একটি নিষ্পাপ শিশু দশতলার ছাদে খেলতে গিয়ে খেলার এক পর্যায়ে ছাদের টিনের উপর ওঠা মাত্রই টিন ভেঙে দশতলার নীচে পড়ে যাবে? এক সেকেন্ডে জীবন নামক এত মায়া এত মজা সবকিছু শেষ হয়ে যাবে? যতবার সিসিটিভি ফুটেজ দেখছি ততবার অবাক হয়ে দেখছি দশতলার টিনের চালে উঠতে গিয়ে মেয়েটি প্রথমবার পা পিছলে গেল। সে উঠতে পারল না। কিন্তু সে থামলো না। দ্বিতীয়বার আবারো কষ্ট করে টিনের চালে উঠে পড়লো এবং এক সেকেন্ডে পুরোনো টিন ভেঙে একদমই নীচে… ইন্নলিল্লাহ ওইন্নাইলাহি রাজিউন। সে চাইলেই কি এই মৃত্যু থেকে রেহাই পেতো? আমি বিশ্বাস করি, না। ঐ পাশে মৃত্যুর দূত তাকে ডাকছে। দুনিয়ার সফর শেষ করতে হবে। জান্নাতের বাগান প্রস্তুত। তার বাবা মায়ের পরীক্ষার ক্ষেত প্রস্তুত। তো আর কিসের অপেক্ষা? সুলাইমান আঃ এর সময়কার ঘটনা। আজরাইল আ: কে পাঠানো হলো এক ব্যক্তির রুহ কবজ করার জন্য। আজরাইল এসে দেখে তার মৃত্যু যেখানে হবার সেখানে সে নেই। তো আজরাইল আ আল্লাহর কাছে ফিরে গেলেন এবং জানতে চাইলেন, তিনি কি করবেন? ঐ লোক তো তার জায়গায় নেই। আল্লাহ বললেন, তুমি চিন্তা করো না সে সেখানে পৌঁছে যাবে। তুমি সুলাইমান আঃ এর দরবারে যাও। মৃত্যুর দূত সেখানে চলে গেলেন এবং মানুষের বেশ ধরে সুলাইমান আঃ এর দরবারে সবার সাথে বসে রইলেন আর মানুষটির গতিবিধি খেয়াল করছিলেন। অন্যদিকে মানুষটিও একটু অবাক হয়ে ভাবছিলেন, ঘটনা কি? লোকটি আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? তিনি ভাবলেন, না আর বসে থেকে লাভ নেই। দেশে ফিরে যাই। তিনি সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হয়ে চলে গেলেন এবং তার দেশের পৌঁছার পর পর মৃত্যু বরণ করলেন। আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া বন্দোবস্ত কি করে বাস্তবায়ন হয় এই ঘটনা আমাদের সামনে রেখে গেলেন যাতে আমরা যেন মৃত্যুর অনিবার্যতা জীবনের পাশাপাশি ধারণ করি। এত কথা বলার একটা ই কারণ নিজেকে এবং আমার আত্মীয় স্বজনকে, বিশেষ করে সন্তানহারা বাবা আমার মামা (Nizam Uddin Nizam কে সান্ত্বনা দেওয়া। মনটা কে শান্ত করার চেষ্টা। ছোট্ট মামনির যাবার সময় এবং পথ এটাই ছিল। এটাই সে তার তকদিরে করে নিয়ে এসেছে। আমাদের এই পরিণতি পরিবর্তনের কোন শক্তি নেই। আমরা কেবল দোয়া করতে পারি, এমন দোয়া যেটা আমাদের শিখিয়ে দেয় দূর্ঘটনাজনিত সমস্ত বিপদ থেকে আল্লাহ যেন আমাদের হেফাজত করেন। তবে আমরা মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ প্রাণী। আমরা জীবনে আসল কথা ভুলে যাই আর দুনিয়ার জীবন নিয়ে মত্ত থাকি। আমাদের unlimited fun and enjoyment এর ভোগবাদী দর্শন আমাদের ভুলিয়ে দেয়, দুনিয়ার জীবন একটি অপরাহ্ন এবং একটি বিকেলের মতো। আমরা সেই একটি ছোট্ট সময়কে আমাদের নফসের পূজা শরীরের খেলা খেলতে খেলতে পার করে দেই। ভাবি, এই আনন্দ এই জীবন। খাই দাই সাজগোজ করি টাকা পয়সা কামাই আর আনলিমিটেড ফূর্তি করতে থাকি। ভাবি, আমাদের আর পায় কে! আসলে, এইসব সব ধোঁকা। মৃত্যু জীবনের পাশে পাশে হেঁটে চলছে। একদিন একসময় হয়ত চোখ রাঙিয়ে ভয় দেখিয়ে নয়তো ভালোবেসে হাত ধরে বলবে, চল। যেতে হবে। সেই দিনটা যেন আমাদের ভালোবাসার হয় আরামের হয় তার জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত? Let’s reflect. Let’s think a moment. Let’s stop a sec and ruminate. দোয়া করি আল্লাহ ছোট্ট নিষ্পাপ মামণিকে জান্নাতের বাগানের মেহমান করুন আমীন। তার বাবা-মায়ের নাজাতের উসিলা করুন। আমিন।
ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কবি পারসিবিসি শেলীর “Ode to the West Wind” কবিতাটা কম বেশি সবারই পড়া এবং জানা। কবি তার এই কবিতায় কিভাবে ইংল্যান্ডের পশ্চিমা বাতাস পুরোনো প্রকৃতির সবকিছু পরিবর্তন করে নতুনদের সূচনা করে, সেটা দেখিয়েছেন আর সেই বাতাসকে যে বসন্তের বোন তাকে বলেছেন তাকেও জাগতিক সমস্ত দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করতে।
পশ্চিম বাতাসের ছোঁয়ায় তিনি যেন ভুলে যান অতীতের সব কষ্ট আর নতুন উদ্যমে জীবনকে চেনেন এই ভেবে যে, শীত আসলে বসন্ত কত ই বা দূর (If Winter Comes Can Spring be far behind?)। তিনি এই প্রাকৃতিক উপাদানকে বলেন তার বৈশিষ্ট্য তাকে দিতে যেন তার লেখা দিয়ে তিনি সারা পৃথিবীতে শান্তির আর সাহসের বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারেন।
কবিতাটির অসম্ভব সুন্দর বৈশিষ্ট্য হলো পশ্চিমা বাতাস কি কি পরিবর্তন আনে কিভাবে পরিবর্তন আনে তার বিশদ বিবরণ। তার একটি হলো এই বাতাস যখন ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বইতে শুরু করে গাছের সব পুরোনো পাতা ঝরতে শুরু করে। কবি বলেছেন, পাতাগুলো এখন রুগ্ন। তারা হয়ে পড়েছে হলুদ, কালো, মরচে লাল, ধূসর । পশ্চিমের বাতাস তাদের উড়িয়ে বেড়ায় আর তার সাথে ফল ফুলের বীজগুলোকেও, পাতা পচে মরে যায় কিন্তু বীজগুলো ঘুমিয়ে পড়ে মাটিতে যতক্ষণ না বসন্ত আসে, তাদের কাঁপিয়ে জাগিয়ে দেয়া বসন্ত…
পুরো বর্ণনা আমাদের সামনে তুলে ধরে ঋতু পরিবর্তনের খেলা: এক ঋতু চলে গেলে আরেক ঋতু আসে, হেমন্তের পর শীত তারপর বসন্ত … প্রকৃতি ধূসর মৃত হতে জেগে উঠে নতুন রুপে নতুন ফল ফসল নিয়ে।
বৈশাখ এলেই এই কবিতা আমার মনে পড়ে যায়। আমি ভাবতে থাকি বাংলাদেশের ঋতু পরিবর্তনের খেলায় বসন্তের বৈশাখে কি কি পরিবর্তন আসে! আমের মুকুল বড় হতে থাকে, কাঁঠালের গায়ে কাঁটা বড় হতে থাকে…এদিকে ফসল তোলা হয়ে গেছে। কৃষকের মনে আনন্দ। খাজনা আদায়ের পরো গোলা ভরে যাবে ধানে । সামনের কয়েকটা মাস আর চিন্তা নেই। তখনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়নি তখনো নিষ্ঠুর জমিদারের হাতে বন্দী হয়নি আয়ের এবং আনন্দের উৎস “ফসল”।
তাইতো বাঙালি মুসলমানের ঘরে ঘরে আনন্দের বন্যা বয়ে যেতো। কৃষকেরা কৃষাণির মায়ার হাতে তৈরি করা পান্তা ইলিশ ভর্তা দিয়ে এবং পিঠা পুলি খেয়ে খাজনা দিতে যেত আর মেতে উঠতো নানারকম মেলায় খেলায়: নৌকা বাইচ, দাড়িয়াবান্ধা, কুস্তি প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। এই উপলক্ষে বসতো মেলা: ঘরের যাবতীয় সব তৈজসপত্র আর বাহারী কসমেটিকস আর সাজসজ্জার উপকরণে। আসতো নাগরদোলা আরো কত কি!
এসব উদযাপনে তো এই মাসকে পূজা, প্রকৃতি পূজা, ধারণার পূজা, বিরোধী পক্ষকে অপরায়ণ এসব ছিলোনা। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে শীত গিয়ে বসন্ত গিয়ে নতুন ফল ফসলের গোলা ভরার যে বার্তা আজকের ব্যবসা বাণিজ্য চাকরিতে ব্যাংক ব্যালেন্সের মতো। খাজনা প্রদান আজকের ট্যাক্স দেয়ার মতোন। কে না খুশী হয় আয় ব্যয়ের সামঞ্জস্যে এবং দিন শেষে তার সঞ্চয়ে লাভে মুনাফায়? আর এই প্রাপ্তি পরিশ্রমী কৃষক কৃষাণি জীবনের অনিবার্য অনুসঙ্গ ছিল বলেই বৈশাখের দিনগুলো তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সময়ের বিবর্তনে যারা একে বিশেষ ধর্মের এবং বিশেষ রাজনীতির রুপ দিয়েছে এবং যারা একে ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কারণে প্রত্যাখ্যান করেছে দুটো অংশ ই প্রান্তিক। প্রথম গোষ্ঠী হলো আদর্শের দিক দিয়ে চরমপন্থী, প্রোপাগান্ডামুখী এবং ইসলামোফোবিক। এরা সংস্কৃতির সব উপাদানকে তাদের রাজনৈতিক রঙ দেয় এবং হাতিয়ার বানায়। এই কাজটি করতে গিয়ে সাংস্কৃতিক অথেনটিসিটি কিংবা ডাইভার্সিটি চাপা দিয়ে মারে। বাংলাদেশের সংস্কৃতির মার্জিত উপাদানগুলোকে হাইজ্যাক করে। করেছে।
অন্যদিকে বৈশাখ-পরিত্যক্ত অংশ ধর্ম এবং সংস্কৃতির যোগাযোগ অস্বীকার করে এবং এই দুটোর কথোপকথন কেমনে হয়, কেমনে মানুষের সুকুমার বৃত্তির চর্চা করতে হয়, কেমনে ধর্ম আর জীবন যাপন পারমিউটেশন কম্বিনেশন করতে হয় এরা এসব নিয়ে ভাবতে চায় না। ভাবে না। জীবন ধর্ম মানুষ সমাজ সংস্কৃতি চারপাশ এদের কাছে কিছু রিচুয়্যালে বাঁধা। এর বাইরে সব “নিষেধ”, সব “হারাম।”
হ্যাঁ বৈশাখের আধুনিক শহুরে এলিটশ্রেণীর ক্যাপাটালিষ্ট এবং কনজিউমারিষ্ট কালচারাল দিক সমালোচনার যোগ্য। আচ্ছা বৈশাখ এলেই আপনাকে কেন নতুন শাড়ি পাঞ্জাবি কিনতে হবে? কেন শাদা লাল ই পড়তে হবে? কেন ইলিশ ভর্তা পান্তা খেতে হবে? কেন সব জিনিস চড়া দামে বিক্রি হবে? এই বাজার বাজেট কাদের সৃষ্টি এ নিয়ে আলাপ যৌক্তিক । কিন্তু ঋতু পরিবর্তনের যে এপিল গ্রামীণ জীবনের যে ইতিহাস ঐতিহ্য নষ্টালজিয়া তাতো এসব ফলস ফিলোসফির এবং তার প্র্যাকটিসের জন্য মিথ্যা হয়ে যেতে পারে না!
এই ইতিহাস ঐতিহ্য নষ্টালজিয়ার চর্চাই আমাকে আকৃষ্ট করে। আমি খুঁজি এর থেকে আমাদের আত্মপরিচয়ের কি বার্তা আছে । খাওয়া দাওয়া পোশাক আশাক গাল গল্পের চকচকে অন্তঃসারশূন্য খোলসের আড়ালে “সত্যিকারের বৈশাখ” খুঁজতে থাকি। এমন বৈশাখ যেখানে আমার পূর্ব পুরুষদের গন্ধ। এমন বৈশাখ যেখানে আমার শিকড়ের চাষবাস। এই চাষবাস একদিনের নয়। একদিনের জন্য নয়।
এটা বোঝার জন্য যে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদেরো ইতিহাসের পুনঃপাঠ এবং সেই সাথে পজিটিভ পরিবর্তনের সুযোগ আছে। বৈশাখীর উষ্ণ বাতাসে দানবীয় শক্তিকে উড়িয়ে দেয়ার মতো উপমার দরকার আছে। রক্তাক্ত অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভালোর পথে গঠনের পথে এগিয়ে যাবার শিক্ষা নেয়ার দরকার আছে।
আর কতকাল বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলবে? কতকাল আমরা শুধু একটা বন্যা আর জলোচ্ছ্বাসের দেশ হয়ে থাকবো? আর কতকাল আমাদের সম্পদ লুট হবে?
আমাদের ফল ফসলের দিন আসুক, আমাদের লুট হয়ে যাওয়া গোলাগুলো আবার সম্পদে ভরে যাক। ঘরে বাইরের সব বর্গী নিপাত যাক। বৈশাখ হয়ে উঠুক সত্যিকারের অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা, সামাজিক যোগাযোগ, এবং শান্তি স্বাধীনতার প্রতীক।
চোখের উপর ঠুলি ছিল কানের ভেতর তালা দেখে গেলি খুশি মনে পাগলামি এক পালা দেখলি না কাকে বলে মানুষ আর মন নামতে নামতে জড়িয়ে নিলি চরম স্খলন বললি না তো একজন ও একটু আওয়াজ করে গুম খুন চলবে না স্বৈরা-চারী জোরে
তোদের
চোখের উপর ঠুলি ছিল কানের ভেতর তালা নৈলে ঠিকই দেখতে পেতি ইনসেইন এক পালা দেখতে পেতি কাকে বলে মানুষ আর মন এক সময়ে থামিয়ে দিতি চরম স্খলন বলতি তোরা, অনেক হলো আর না আর না গুম খুন আর দালালিতে পার তো পাবো না
অবশ্য আমি বোকা হায়রে হায় কাকে কি বলি অন্ধ জ্ঞানের বন্ধ দুয়ার কোন চাবিতে খুলি ?
এমন চাবি গড়িয়ে দেয় গভীর পাপের অনুতাপ অশ্রু অঞ্জলি…